প্রাণঘাতী বন্যার পর নেপালে চলছে ডিএনএ পরীক্ষা ও প্রতীকী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া
নেপালের সংবেদনশীল হিমালয় অঞ্চলে প্রাণঘাতী আকস্মিক বন্যায় গ্রাম ও ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর স্বজনহারা পরিবারগুলো নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে ডিএনএ নমুনা জমা দিচ্ছে এবং অনেকেই প্রতীকী অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করছে।
গত ২৬ আগস্ট চীন-নেপাল সীমান্তে হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট জমাট বরফজল, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ার পর উদ্ধারকারী দলগুলো ১ হাজার ২০০টিরও বেশি মরদেহ উদ্ধার করেছে এবং প্রায় ৪ হাজার ৮০০ জন মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
প্রথম এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নেপালের অত্যন্ত উঁচু এলাকা রাসায়া জেলার সরকারি কর্মকর্তা ধ্রুব প্রসাদ অধিকারী বলেছেন, এখানকার মানুষ এক অকল্পনীয় দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও কাদা ঢাকা রাস্তায় ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় সফর করে এলাকাটিতে পৌঁছানো এএফপির এক সাংবাদিককে তিনি বলেন, ‘আমাদের বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, এই বন্যা আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ।’
এদিকে, রাজধানী কাঠমান্ডুতে বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) শত শত মৃতদেহের মধ্য থেকে নিজের স্বজনকে শনাক্ত করার আশায় ডিএনএ নমুনা দিতে শত শত মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। মর্গগুরোতে স্থান সংকুলান না হওয়ায় ইতোমধ্যেই কিছু মরদেহ দাফন ও সৎকার করা হয়েছে।
হাত ধরে থাকা ছয় বছর বয়সী ভাগ্নেকে দেখিয়ে সুস্মিতা লো (২১) এএফপিকে বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে আমার বাবার কোনো খোঁজ নেই, তাই আমি এখানে ডিএনএ নমুনা দিতে এসেছি।’ সুস্মিতা জানান, তার ভাগ্নের বাবাও নিখোঁজ রয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ‘রাতে সে তার বাবাকে ডাকে, কিন্তু সে এখনো নিখোঁজ সে কথা আমরা তাকে বলিনি। সে খুবই ছোট।’
তবে, অন্যরা আশা ছেড়ে দিয়ে হিন্দু রীতি অনুযায়ী খড়ের পুতুল পুড়িয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন করছেন।
স্বামীর শেষকৃত্যে কান্নাভেজা ছেলেকে পাশে নিয়ে ডোলমা নেওয়ার তামাং বলেন, ‘তার আত্মা যেন মুক্তি পায়, সে যেখানেই থাকুক যাতে শান্তিতে ও সুখে থাকে, সেজন্য আমাদের এটি করতেই হতো।’
নেপালি উদ্ধারকারীরা এখনও জীবিতদের খুঁজে পাওয়ার আশায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন; এর মধ্যে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একাধিক সুড়ঙ্গ ঢেকে ফেলা জমে থাকা থকথকে কাদা কেটে পথ চেনার চেষ্টা করছেন উদ্ধারকারীরা। এখনো সুড়ঙ্গগুলো থেকে কেবল মরদেহ উদ্ধার করা গেছে, তবে উদ্ধারকারী দলগুলো ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে ড্রিলিং ও বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পথ তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, তিনি এখনও আশা করেন নিখোঁজদের কেউ কেউ জীবিত থাকতে পারেন। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘অলৌকিক ঘটনা সত্যিই ঘটে। এই মুহূর্তে আমি পুরোপুরি আশা ছেড়ে দিতে চাই না।’
বৈশ্বিক দায়িত্ববোধ
তিন কোটি মানুষের প্রধানত গ্রামীণ দেশ নেপালে আঘাত হানা এই ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা দেখে জনমনে ক্ষোভ বাড়ছে। বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে দেশটির অবদান অত্যন্ত সামান্য হলেও, এটি এর মারাত্মক পরিণতির শিকার হচ্ছে।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ সতর্ক করে বলেছেন, এই বিপর্যয় হিমালয় বেষ্টিত দেশটির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকির একটি ‘গুরুতর সংকেত’।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিমালয় দ্রুত উত্তপ্ত হচ্ছে, যা হিমবাহের গলনকে ত্বরান্বিত করছে। বিস্তৃত হিমালয় ও হিন্দুকুশ পর্বতমালার হিমবাহগুলো এই পার্বত্য অঞ্চলের প্রায় ২৪ কোটি মানুষের পাশাপাশি ভাটিতে থাকা আরও ১৬৫ কোটি মানুষের জন্য পানির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
এক সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে বালেন শাহ লেখেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন পুরো বিশ্বের অবদান, আর দুর্যোগ মোকাবিলাও একটি বৈশ্বিক দায়িত্ব।’
ব্যাপক দুর্নীতি এবং নাজুক অর্থনীতির কারণে হওয়া মারাত্মক গণবিক্ষোভে তৎকালীন সরকারের পতন ঘটার এক বছর পূর্তি হতে চলেছে চলতি মাসে। এমন একটি সময়ে এই ধরনের বিশাল বিপর্যয় সামলানোর মতো সীমিত সম্পদ রয়েছে নেপালের।
প্রাথমিক মূল্যায়নে জাতিসংঘ কেবল অবকাঠামোগত কাঠামোর ক্ষতিই ১৫ কোটি ৮ লাখ ডলার হিসাবে নির্ধারণ করেছে। তবে সংস্থাটি সতর্ক করেছে যে, সড়ক ও সেতু, কৃষিজমি এবং মানবিক সহায়তার ব্যয়সহ মোট ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে।
পুনর্গঠনে শত শত কোটি ডলার খরচ হতে পারে বলে সতর্ক করেছে কাঠমান্ডু।
৩৬ বছর বয়সী সাবেক র্যাপার ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ আজ বুধবার সংসদে দেওয়া এক আবেগপূর্ণ ভাষণে এই দুর্যোগকে জাতীয় ‘বজ্রপাত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বালেন শাহ বলেন, ‘বন্যা দুর্গতদের কান্নার শব্দ শুনলে আমার বুক কেঁপে ওঠে। কিন্তু শরীর ক্লান্ত বলেই আমাদের হাত গুটিয়ে বসে থাকার সময় নেই। বুক ভাঙা কষ্ট নিয়েও আমাদের একসাথে বসে শোক প্রকাশ করার অবকাশ নেই।’
গণসৎকার ও দাফন
ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা কেমন ছিল তার একটি উদাহরণ দিয়ে চীনা রাষ্ট্রীয় মাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত গিরোং বন্দরে চলাচলের রাস্তাটি দিনরাত ২৪ ঘণ্টা মেরামতের পর অবশেষে আজ পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে।
নেপাল জানিয়েছে, বুধবার পর্যন্ত ১,২০৪টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৪,২১৬ জন মানুষ এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম আজ ২১ জনের মৃত্যু এবং ৫৪১ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর দিয়েছে। এর ফলে মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১,২২৫ জনে এবং নিখোঁজের সংখ্যা ৪,৭৫৭ জন।
নিখোঁজদের মধ্যে ৩০টিরও বেশি দেশের ৮০০ জনেরও বেশি বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তাদের মধ্যে হিমালয়ে ট্রেকিং করতে আসা পর্যটক এবং তিব্বতের পবিত্র কৈলাশ পর্বতে আধ্যাত্মিক শান্তির খোঁজে যাওয়া হিন্দু তীর্থযাত্রীরাও রয়েছেন।
এছাড়া, ভারতে নদীগুলোর ভাটি থেকে অন্তত ১৭টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক