নেপালে ‘জেন-জি’ বিপ্লবের এক বছর : তরুণদের প্রত্যাশার বাস্তবায়ন কতটুকু?
গত বছরের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছিল নেপালের হাজার হাজার তরুণ বা ‘জেন-জি’ প্রজন্ম। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর দমনপীড়ন, ৭৬ জনের মৃত্যু ও কারফিউ তোয়াক্কা না করে টানা আন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকারকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করেছিল তারা। এক বছর পর ও দেশটির নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে- যেসব দাবি নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা কতটা পূরণ হয়েছে?
২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর কাঠমান্ডুসহ নেপালের বিভিন্ন শহরে জেন-জি আন্দোলন শুরু হয়। তৎকালীন ওলি সরকারের একাধিক দুর্নীতি কেলেঙ্কারি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সাময়িক বন্ধ করা ও সরকারি কর্মকর্তাদের সন্তানদের (নেপো কিডস) বিলাসবহুল জীবনযাপনের প্রদর্শনীতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তরুণ সমাজ। ৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে চলতি বছরের মার্চে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ৩৫ বছর বয়সী সাবেক র্যাপার ও কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বাধীন নতুন দল ‘রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি’ (আরএসপি) দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিশাল জয় পায়। বালেন্দ্র শাহ নেপালের সর্বকনিষ্ঠ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
জেন-জি আন্দোলনের মূল দাবিগুলোর বাস্তবায়ন কতটুকু
১. সরকার পতন ও নতুন নির্বাচন :
আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলির পদত্যাগ, সংসদ ভেঙে দেওয়া ও নতুন নির্বাচন। আন্দোলন শুরুর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ওলি পদত্যাগ করেন, সংসদ ভেঙে দেওয়া হয় ও অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে চলতি বছর মার্চে সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় আসে।
২. দুর্নীতিবাজ ও হামলাকারীদের বিচার :
আন্দোলনকারীদের ওপর সরাসরি গুলি চালানোর নির্দেশদাতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি তোলা হয়েছিল। চলতি বছরের মার্চে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলি ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে এপ্রিল মাসে সুপ্রিম কোর্টের আদেশে তারা মুক্তি পান এবং এখনও তাদের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন বা বিচার নিশ্চিত হয়নি।
৩. প্রশাসনিক সংস্কার ও দুর্নীতি প্রতিরোধ :
বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার রাজনৈতিক রদবদল হলেও কাঠামোগত বা প্রশাসনিক জায়গায় বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসেনি। দুর্নীতির সংস্কৃতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এখনো আগের মতোই বজায় রয়েছে।
বর্তমানে জেন-জি আন্দোলনের উদ্যোক্তারা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন। একদল সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হয়ে নতুন সরকারে যোগ দিয়েছেন, অন্যদল রাজপথের সক্রিয় অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে বর্তমান সরকারের সমালোচনা করছেন। মে মাসে সংবিধান সংশোধনের বৈঠকে জেন-জি অ্যাক্টিভিস্টদের আমন্ত্রণ জানানো হলে ২৯ জনের মধ্যে ২৫ জনই তা বয়কট করেন।
অ্যাক্টিভিস্টদের দাবি, সরকার এখনও মূল আন্দোলনকারীদের ও আন্দোলন চলাকালীন অগ্নিসংযোগের অভিযোগে কারাবন্দি থাকা ৯০০ থেকে এক হাজার ৬০০ জন তরুণকে মুক্তি দিতে পারেনি বা তাদের বিষয়ে সদয় নীতি গ্রহণ করেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তরুণ নেতৃত্ব ক্ষমতায় আসায় মানুষের প্রত্যাশার পারদ অনেক উঁচুতে উঠেছে। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন এবং সুনির্দিষ্ট আইনি ও অর্থনৈতিক সংস্কার আনব না পারলে নেপালে আবারও জেন-জিদের অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় সাম্প্রতিক বিধ্বংসী বন্যায় এক হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানির কারণে পুরো দেশ যখন শোক পালন করছে, তখন সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণের পাশাপাশি জাতীয় এ দুর্যোগ মোকাবিলা করা।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক