৯/১১ হামলার ২৫ বছর : যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ব্যর্থতা যেভাবে বদলে দিল বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা
যেকোনো সরকারের প্রধান দায়িত্ব হলো তার নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়া। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালনে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। প্রয়োজনীয় গোয়েন্দা তথ্য হাতেই ছিল। কিন্তু সঠিক সময়ে সেগুলো মেলানো সম্ভব হয়নি।
আজ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ওই হামলার ২৫ বছর পূর্তিতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আল-কায়েদার সন্ত্রাসীরা বিমান ছিনতাই করে নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলা চালায়। সেই হামলায় ২ হাজার ৯৭৭ জন নিরপরাধ মানুষ প্রাণ হারান। এর ৯ দিন পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ ঘোষণা করেন। এই ঘটনা পরবর্তী দুই দশকের বৈশ্বিক পররাষ্ট্র ও গোয়েন্দা নীতি নির্ধারণ করে দেয়।
নাইন-ইলেভেন হামলা হঠাৎ করে ঘটেনি। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ বহু বছর আগেই আল-কায়েদা ও ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে অবগত ছিল। এমনকি লাদেনকে ধরার জন্য একটি আলাদা টাস্কফোর্সও ছিল। তা সত্ত্বেও এ ঘটনাকে মার্কিন গোয়েন্দা ব্যবস্থার ‘কল্পনাশক্তির ব্যর্থতা’ হিসেবে দেখা হয়। সিআইএ এবং এফবিআইয়ের কাছে তথ্য থাকলেও তারা তা একে অপরের সঙ্গে শেয়ার করেনি।
এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রের ১৮টি গোয়েন্দা সংস্থার কাজের সমন্বয়ের জন্য ‘ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টার’ এবং ‘ডাইরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স’ পদ তৈরি করা হয়। একই সঙ্গে ইউকে, ইউএসএ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডকে নিয়ে গঠিত ‘ফাইভ আইজ’ জোটে তথ্য আদান-প্রদান ব্যবস্থা অনেক আধুনিক করা হয়। কিন্তু এরপরও ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় ভুয়া ‘মারাত্মক অস্ত্র’ সংক্রান্ত তথ্যের ওপর ভরসা করে বড় গোয়েন্দা ভুল করেছিল যুক্তরাজ্যের এমআই৬।
পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫-ও একাধিক হামলা ঠেকানোয় ব্যর্থ হয়েছে। ২০০৫ সালের ৭ জুলাই লন্ডনে আত্মঘাতী হামলা এবং ২০১৭ সালের ম্যানচেস্টার অ্যারেনা হামলা এর অন্যতম উদাহরণ।
সাবেক এমআই৫ প্রধান লর্ড জোনাথন ইভান্স জানান, পূর্বে আল-কায়েদাই মূল হুমকি ছিল। তবে বর্তমানে রাশিয়া, চীন ও ইরানের মতো রাষ্ট্রীয় হুমকি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ইরানে আক্রমণ চালান। জবাবে ইরান কৌশলগত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে মারাত্মক ধস নামে। ট্রাম্পের কৌশলেও এই মারাত্মক গোয়েন্দা মূল্যায়নের অভাব ছিল বলে মনে করা হয়।
৯/১১ হামলার পর দ্বিতীয় দফায় হামলার ভয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। বহু মানুষকে অবৈধভাবে আটক করে গুয়ানতানামো বে-তে রাখা হয়। ২০২৫ সালেও যুক্তরাষ্ট্র দুই শতাধিক মানুষকে এল সালভাদরের বিতর্কিত কারাগারে পাঠিয়েছে। এছাড়া ২০০৪ সালে লিবিয়ার এক নাগরিকে অপহরণ করে গাদ্দাফি সরকারের কাছে হস্তান্তরের ঘটনায় ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চায় যুক্তরাজ্য।
বিগত ২৫ বছরে পশ্চিমারা যখন আফগানিস্তান বা ইরাকে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে ব্যস্ত ছিল, তখন রাশিয়া ও চীন নিজেদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত শক্তি অনেক বাড়িয়ে নিয়েছে। প্রাক্তন এমআই৬ প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়ঙ্গার স্বীকার করেন, সন্ত্রাসবাদের পেছনে অতিরিক্ত মনোযোগ দিতে গিয়ে তারা চীনের শক্তির উত্থান লক্ষ্য করতে ব্যর্থ হয়েছেন।ৎ
বর্তমান যুগ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের। তা সত্ত্বেও গোয়েন্দা তথ্যের ভুল মূল্যায়ন আজও থামেনি। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন কিংবা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, বড় ধরনের কৌশলগত ভুলের পুনরাবৃত্তি এখনও ঘটছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক