ভাঙার পথে যুক্তরাজ্য, শিগগিরই আসছে ঘোষণা
যুক্তরাজ্য থেকে স্বাধীনতার দাবিতে নতুন করে একজোট হচ্ছেন স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের নেতারা। তিন অঞ্চলের ফার্স্ট মিনিস্টার আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে এক নজিরবিহীন বৈঠকে বসবেন। বৈঠকে স্বাধীনতার গণভোট আয়োজনের অধিকার দাবি করে একটি যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করার কথা রয়েছে।
দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্ডিফ বে-সংলগ্ন পাঁচ তারকা সেন্ট ডেভিডস হোটেলে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার ও এসএনপি নেতা জন সুইনি, ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার ও প্লেইড কামরু নেতা রুন আপ আইওয়ার্থ এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টারের পাশাপাশি আয়ারল্যান্ডের সিন ফেইন দলের সভাপতি ও বিরোধীদলীয় নেতা মেরি লু ম্যাকডোনাল্ড অংশ নেবেন। খবর দ্য টেলিগ্রাফের।
বৈঠকে তিন অঞ্চল নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার এবং স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের দাবি জোরালো করার পাশাপাশি পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করবে।
মে মাসের নির্বাচনে ওয়েলসে লেবার পার্টির বড় পরাজয়ের পর প্রথমবারের মতো যুক্তরাজ্যের তিনটি ডেভলভড অঞ্চলের সরকারেই স্বাধীনতাপন্থী দলগুলোর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ওয়েলসের সেনেড নির্বাচনে প্লেইড কামরু সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে এসেছে। দলটির নেতা রুন আপ আইওয়ার্থ ফার্স্ট মিনিস্টারের দায়িত্ব নিয়েছেন।
স্কটল্যান্ডে ছয়টি হলিরুড আসন হারালেও এসএনপি এখনও প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। অন্যদিকে উত্তর আয়ারল্যান্ডে ২০২২ সালের স্টর্মন্ট নির্বাচনে সিন ফেইন জয়ী হয়। তবে ডিইউপির বয়কটের কারণে মিশেল ও’নিল ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফার্স্ট মিনিস্টারের দায়িত্ব নিতে পারেননি। আগামী বছর উত্তর আয়ারল্যান্ডের নির্বাচনে সিন ফেইন আবারও ক্ষমতায় থাকবে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি বলেন, প্রথমবারের মতো স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড—তিন অঞ্চলেই স্বাধীনতাপন্থী ফার্স্ট মিনিস্টার রয়েছেন।
জন সুইনি বলেন, এটি স্পষ্ট করে যে বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো আর টেকসই নয় এবং ওয়েস্টমিনস্টারকে যুক্তরাজ্য-পরবর্তী ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
সুইনি আরও বলেন, সাংবিধানিক পরিবর্তনের পক্ষে গতি এখন স্পষ্ট। তার দাবি, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে এখন হয়তো ভাবতে হচ্ছে যে ইতিহাসে তিনি যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত হতে পারেন।
সম্প্রতি ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ইঙ্গিত দেন, স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার পক্ষে জনগণের মধ্যে ‘স্পষ্ট ঐকমত্য’ তৈরি হলে নতুন করে স্বাধীনতার গণভোট আয়োজন করা যেতে পারে।
তার এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করেই স্বাধীনতাপন্থী নেতাদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে পরে সুইনিকে লেখা এক চিঠিতে বার্নহ্যাম স্পষ্ট করেন, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিয়ে আর কোনো গণভোট আয়োজনের প্রশ্নই নেই।
বার্নহ্যাম বলেন, স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার গণভোটের পক্ষে কোনো ঐকমত্য নেই। একইভাবে উত্তর আয়ারল্যান্ডের জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বর্তমানে যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে চায়—এমন স্পষ্ট ভিত্তিও নেই।
বার্নহ্যাম আরও বলেন, লেবার পার্টির ২০২৪ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছিল যে দলটি স্বাধীনতা কিংবা আরেকটি গণভোটকে সমর্থন করে না।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ‘একীভূত আয়ারল্যান্ড’ দেখতে চান বলে মন্তব্য করেছেন। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ডাবলিন সফরের সময় তিনি বলেন, উত্তর আয়ারল্যান্ড আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হলে সেটি ‘দারুণ বিষয়’ হবে।
তার এই মন্তব্য উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
গুড ফ্রাইডে চুক্তির অধীনে উত্তর আয়ারল্যান্ডের যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে একীভূত হওয়ার বিষয়ে গণভোটের একটি সাংবিধানিক পথ রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, উত্তর আয়ারল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যুক্তরাজ্য ছাড়তে চাইতে পারেন—এমন সম্ভাবনা তৈরি হলে গণভোট আয়োজন করা যেতে পারে।
সিন ফেইনের এক সূত্র বলেছে, প্রতিটি জাতিরই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে। তাদের ভাষায়, আইরিশ ঐক্য কোনো দূরবর্তী আকাঙ্ক্ষা নয়। নতুন আয়ারল্যান্ড গঠনের কাজ এখনই শুরু হওয়া উচিত।
কার্ডিফের বৈঠকে চারটি প্রধান বিষয়ে সহযোগিতার পরিকল্পনা করা হবে—অর্থনীতি, জ্বালানি, ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার।
তিন দলই নিজেদের ভবিষ্যৎ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত করার পক্ষে অবস্থান নেবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস নতুন সদস্য হিসেবে এবং উত্তর আয়ারল্যান্ড আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের অংশ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে থাকবে।
প্লেইড কামরু বৈঠকে ওয়েলস সরকারের হাতে কর ও সরকারি ব্যয়ের ওপর আরও ক্ষমতা দেওয়ার দাবিও তুলবে। দলটি ক্রাউন এস্টেট থেকে পাওয়া আয়, বিশেষ করে অফশোর উইন্ড ফার্ম নির্মাণের জন্য ব্যবহৃত সমুদ্রতলের রাজস্ব ওয়েলস সরকারের হাতে দেওয়ার দাবি জানাবে।
এছাড়া বর্তমান বার্নেট ফর্মুলার পরিবর্তে ওয়েলসের জন্য আরও অনুকূল অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং পুলিশ ও রেল খাতের অর্থায়নের মতো আরও কিছু ক্ষমতা ওয়েলস সরকারের কাছে হস্তান্তরের দাবি জানাবে দলটি।
তিন অঞ্চলের দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়িয়ে অর্থনীতি, জ্বালানি, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক এবং সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে যৌথভাবে কাজ করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক