ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেই স্কুলে ফিরছে লেবাননের শিশুরা
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় নিজের স্কুলটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর, আট বছর বয়সী ইয়ারা আজমি চলতি সপ্তাহে একটি দরজা ও জানালাবিহীন শ্রেণিকক্ষে তার শিক্ষাবর্ষ শুরু করেছে।
শিক্ষাগত শ্রেষ্ঠত্বের জন্য স্থানীয়ভাবে সুপরিচিত বুরজ কালাওয়ে এলাকার আজমির প্রাথমিক স্কুলটিতে গত মে মাসে হামলা চালায় ইসরায়েল। এর দুই মাস আগে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে হামলা চালিয়ে লেবাননকে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছিল।
সাধারণ কংক্রিটের সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় বিনুনি করা চুলের ছোট মেয়ে আজমি বলে, ‘আমরা স্কুলে ফিরে আসতে পেরে আনন্দিত, তবে আমরা আগে বেশি খুশি ছিলাম। আমরা ছবি আঁকতাম, খেলাধুলা করতাম, কিন্তু এখন কোনো বেঞ্চ বা চেয়ার নেই।’
গ্রীষ্মকালীন ছুটি শেষে সোমবার ক্লাসে ফিরে আজমি এবং অন্যান্য শিক্ষার্থীরা তাদের পুরোনো স্কুল ভবনে যাওয়ার পরিবর্তে নির্মাণাধীন একটি ভবনে পাঠদানে অংশ নেয়। ভবনটি মূলত প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের জন্য তৈরি করা হচ্ছিল।
শিশুরা যখন তাদের পাঠ নিচ্ছিল, তখন কাচহীন জানালা দিয়ে সূর্যের আলো অসমাপ্ত শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করছিল; আর বাইরে, যেখানে একসময় দেয়াল ছিল, সেখানে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া রডের স্তূপ মরা ঝোপঝাড়ের মতো মাটি থেকে বের হয়ে ছিল।
শিক্ষার্থীরা মূলত ইসরায়েলি হামলার তীব্র শিকার হওয়া এলাকাগুলো থেকে এসেছে এবং তাদের অধিকাংশই যুদ্ধের সময় বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। আজমির মতো কেউ কেউ ফিরে এসে দেখেছে যে তাদের ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে।
'চোখে বিষাদের ছাপ'
স্কুলের উঠোন থেকে এএফপি-কে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা মে মেহদি বলেন, ‘ওদের চোখের কোণে বিষাদের ছাপ রয়েছে, ওদের প্রত্যেকেরই নিজস্ব গল্প আছে।’ স্মার্টফোনে তার গর্বের স্কুলটির অতীত রূপ কেমন ছিল তা দেখাতে দেখাতে তিনি বলেন, ‘তবে ওরা যে এখানে ফিরে এসেছে, তাতেই আমি খুশি।’
বর্তমানে ব্যবহৃত ভবনটিতে মেহদির কোনো নিজস্ব অফিস কক্ষ নেই, এমনকি শিক্ষকদের বসার জন্যও আলাদা কোনো ঘর নেই।
২৪টি শ্রেণিকক্ষবিশিষ্ট এই স্কুলে বর্তমানে প্রায় ২৫০ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধিত রয়েছে। গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলার পর তেহরানের সমর্থনে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে আক্রমণ চালিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে এই স্কুলে অন্তত ৬০০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করত।
এর জবাবে ইসরায়েল ব্যাপক বিমান হামলা এবং স্থল অভিযান শুরু করে, যাতে ৪ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়। লেবানিজ কর্তৃপক্ষের মতে, এর মধ্যে ২৬১ জন শিশু রয়েছে।
সংঘাতের কারণে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল, তবে জুনের চুক্তি ও স্মারক স্বাক্ষরের পর সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় আট লাখেরও বেশি মানুষ দেশে ফিরে এসেছে।
দক্ষিণাঞ্চলের যে সমস্ত স্কুলকে আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে, সেগুলোতে বাস্তুচ্যুত মানুষ এবং শিক্ষার্থীরা এখন যৌথভাবে স্থান ভাগাভাগি করে থাকছে—যার জন্য ভবনের আলাদা তলা বরাদ্দ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বারবার হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা চালাতে বা অস্ত্র লুকাতে স্কুলসহ বেসামরিক ভবন ব্যবহারের অভিযোগ তুলে এসেছে।
তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো হিজবুল্লাহর সাথে যুদ্ধে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধের জন্য ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করেছে।
লেবানিজ কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে, ইসরায়েল দক্ষিণাঞ্চলের ঘরবাড়ি, স্কুল, উপাসনালয় এবং বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ পরিকাঠামোসহ পুরো গ্রাম একের পর এক ধ্বংস করছে।
'ধ্বংসস্তূপ, নিরাপত্তাহীনতা ও বাস্তুচ্যুতি'
বুরজ কালাওয়ের অনেক শিশু নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করতে পারেনি; তারা এখনও বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছে অথবা দক্ষিণাঞ্চলের একটি বড় অংশ দখল করে রাখা ইসরায়েলি সেনাদের ১ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বের এই শহরে ফিরতে ভয় পাচ্ছে।
গত বৃহস্পতিবারও পার্শ্ববর্তী কানতারা গ্রামে ইসরায়েলি হামলা চালানো হয়।
চলতি মাসের শুরুর দিকে ইউনিসেফ জানিয়েছিল, লেবাননের প্রায় এক লাখ শিক্ষার্থী ক্ষয়ক্ষতি, ধ্বংসযজ্ঞ, নিরাপত্তাহীনতা বা বাস্তুচ্যুতির কারণে এই শিক্ষাবর্ষে তাদের স্কুলে ফিরতে পারেনি।
ইউনিসেফের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুদ্ধে ৪৩৬টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৩৭টি স্কুল সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে।
বুরজ কালাওয়ে স্কুলে আগে একটি গবেষণাগার, একটি কম্পিউটার রুম এবং একটি ইন্টারঅ্যাক্টিভ রুম ছিল। বর্তমানে যে স্থান থেকে এখনও ধ্বংসস্তূপ সরানো সম্ভব হয়নি, সেখানে সরকার-অর্থায়নে প্রি-ফ্যাব্রিকেটেড অস্থায়ী রুম স্থাপন করা হচ্ছে।
'বাবার মুখ উজ্জ্বল করতে চাই'
শিক্ষিকা হোদা নাজদি চরম প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও শিক্ষা চালিয়ে যাওয়া এবং ভালো ফলাফল করার গুরুত্ব তুলে ধরে ক্লাস পরিচালনা করেন।
৪২ বছর বয়সী এই শিক্ষিকা বলেন, ‘আমার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে, ধ্বংস হয়েছে আমার স্কুলও... (কিন্তু) এই শিক্ষার্থীরাই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার শক্তি ও ইচ্ছা জোগায়।’
যুদ্ধের সময় বৈরুতে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বাস্তুচ্যুত হওয়া শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মোজান্নার জানায়, হারিয়ে যাওয়া বছরের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সে স্কুলে ফিরে আসতে পেরে খুবই আনন্দিত।
অনলাইনে পাঠ নেওয়ার সুযোগ না থাকার কথা উল্লেখ করে মোজান্নার বলে, ‘আমার কোনো বই ছিল না, ফোন ছিল না, আর ইন্টারনেটও ছিল না। এখন আমি আমার বাবার মুখ উজ্জ্বল করতে চাই।’
তবে স্কুলে ফেরা অনেকের জন্যই বেদনাদায়ক স্মৃতি ফিরিয়ে এনেছে, যেমন ১৪ বছর বয়সী রাওয়ান ফকিহ। সে বলে, ‘আমার মনে পড়ে গেল আমরা একসাথে কী কী কাজ করতাম, পরীক্ষার সময় কেমন মানসিক চাপ যেত... আর মনে পড়ে গেল আমার সেই বন্ধুর কথা, যে ইসরায়েলি হামলায় মারা গেছে।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক