‘অণুর দর্পণ’ রহস্যের সমাধান করে রসায়নে দুই বিজ্ঞানীর নোবেল
‘অণুর দর্পণ’ রহস্যের সমাধান করে ২০২৬ সালের রসায়নে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি রসায়নবিদ হেনরি কাগান এবং জাপানি রসায়নবিদ কেনসো সোয়াই। আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) সুইডেনের স্টকহোমে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে রসায়নে নোবেল বিজয়ীর নাম ঘোষণা করে।
কিছু অণু যেমন অ্যামিনো অ্যাসিড—দুটি ভিন্ন রূপে থাকতে পারে, যেগুলো একে অপরের আয়নার প্রতিবিম্ব। কিন্তু জীবিত প্রাণীর শরীরে এসব অণুর সাধারণত একটি রূপই পাওয়া যায়। কীভাবে প্রকৃতিতে এই রাসায়নিক অসমতা তৈরি হলো, দীর্ঘদিন ধরে সেটিই ছিল রসায়নবিদদের কাছে এক বড় রহস্য। এই রহস্যের সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের জন্য নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন হেনরি কাগান এবং কেনসো সোয়াই।
জীবনের রসায়নকে রসায়নবিদেরা হোমোকাইরাল বলে থাকেন। গ্রিক ভাষায় ‘একই’ ও ‘হাত’ শব্দ থেকে এই নামের উৎপত্তি। মানুষের দুই হাত যেমন দেখতে একে অপরের আয়নার প্রতিবিম্ব হলেও একে অপরের ওপর পুরোপুরি মেলে না, তেমনি অ্যামিনো অ্যাসিডেরও দুটি আয়না-প্রতিবিম্ব রূপ রয়েছে। তবে আমাদের কোষের প্রোটিনে সাধারণত এর একটি রূপই ব্যবহৃত হয়। অন্য রূপটি প্রকৃতিতে অত্যন্ত বিরল।
দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা জানতে চেয়েছেন, কীভাবে এই একক-রূপের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বা হোমোকাইরালিটি সৃষ্টি হতে পারে। পরীক্ষাগারে এমন রাসায়নিক বিক্রিয়া চালানো হলে, যেগুলো থেকে একই অণুর দুটি আয়না-প্রতিবিম্ব রূপ তৈরি হতে পারে, সাধারণত উভয় রূপই সমান অনুপাতে পাওয়া যেত।
তবে ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জীবন্ত প্রাণীর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে এমন অনেক অণুর ক্ষেত্রে দুই আয়না-প্রতিবিম্বর একটি কাঙ্ক্ষিত প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে, অন্যটি নাও করতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে শুধু একটি নির্দিষ্ট রূপ তৈরি করার উপায় খুঁজছিলেন।
২০২৬ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে এমন আবিষ্কারের জন্য, যার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা রাসায়নিক বিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে কাঙ্ক্ষিত একটি আয়না-রূপকে প্রাধান্য দিতে সক্ষম হয়েছেন।
রসায়নে নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান হেইনার লিঙ্কে বলেন, হেনরি কাগান ও কেনসো সোয়াই এক শতাব্দীরও বেশি পুরোনো একটি রাসায়নিক রহস্যের সমাধান দিয়েছেন—কীভাবে হোমোকাইরালিটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে সৃষ্টি হতে পারে। তারা যে রাসায়নিক বিক্রিয়াগুলো তৈরি করেছেন, সেগুলো অসাধারণ।
১৯৮৬ সালে কাগান এই গবেষণায় প্রথম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি করেন। তিনি রাসায়নিক বিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এর মাধ্যমে আগে যতটা সম্ভব বলে ধারণা করা হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি পরিমাণে অণুর একটি নির্দিষ্ট আয়না-প্রতিবিম্ব তৈরি করা সম্ভব হয়।
এরপর ১৯৯৫ সালে কেনসো সোয়াই গবেষণাটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেন। ওই বছর প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণাপত্রে তিনি এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়ার নকশা উপস্থাপন করেন, যার মাধ্যমে হোমোকাইরাল রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়।
অবশেষে ২০০৩ সালে সোয়াই সফল হন। তিনি এমন একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া প্রদর্শন করেন, যেখানে সম্ভাব্য দুটি আয়না-প্রতিবিম্বের মধ্যে মাত্র একটিই তৈরি হয়। জীবনের স্বাভাবিক রাসায়নিক প্রক্রিয়া ছাড়া এর আগে কেউ এমন সাফল্য অর্জন করতে পারেননি।
কাগান ও সোয়াইয়ের আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানীরা এখন বুঝতে পারছেন, কীভাবে হোমোকাইরালিটি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ওষুধ তৈরির জন্য নির্দিষ্ট অণু ও রাসায়নিক বিক্রিয়া নকশা করার ক্ষেত্রে তাদের আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ফলে শত বছরের পুরোনো একটি রাসায়নিক রহস্যের সমাধানের পাশাপাশি, তাদের গবেষণা আধুনিক ওষুধ উৎপাদন ও নতুন রাসায়নিক অণু তৈরির ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক