রিপাবলিকান প্রার্থীকে ডেমোক্র্যাট নেত্রীর সমর্থন, দলে তীব্র বিরোধ
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সিনেট নির্বাচনে নিজ দলের প্রার্থীকে বাদ দিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসওম্যান হেইলি স্টিভেনস। নির্বাচনের মাত্র দুই দিন আগে তার এ সিদ্ধান্তে ডেমোক্র্যাট শিবিরে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। খবর বিবিসির।
স্থানীয় সময় রোববার (১ নভেম্বর) রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন স্টিভেনস। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক ভিডিওবার্তায় তিনি বলেন, আবদুল এল-সায়েদের প্রচারশিবিরের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই।
স্টিভেনস বলেন, মিশিগানের মানুষ হিসেবে আমাদের পরিচয় ঘৃণা নয়। আমাদের ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর কাছ থেকে এখন যে বক্তব্য আসছে, তা আমাদের পরিচয় তুলে ধরে না। এ কারণেই আমি মাইক রজার্সকে সমর্থন করছি।
ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক নির্বাচনে এল-সায়েদের কাছে সিনেট মনোনয়ন হারিয়েছিলেন স্টিভেনস। তার এই সিদ্ধান্তে দলের অনেক নেতা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কেউ কেউ একে ‘জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
মধ্যপন্থী ডেমোক্র্যাট স্টিভেনস এবং দলের বামপন্থী হিসেবে পরিচিত এল-সায়েদের মধ্যে বিরোধ সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রকাশ্য রূপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েল-সমর্থনের সঙ্গে পণ্যমূল্য বৃদ্ধির সম্পর্ক তুলে ধরে একটি বিজ্ঞাপন প্রচার করেছিল একটি উদারপন্থী সংগঠন। বিজ্ঞাপনটির নিন্দা জানাতে এল-সায়েদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন স্টিভেনস। এল-সায়েদ বিজ্ঞাপনটির সমালোচনা করে জানান, এর বিষয়বস্তুর সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
দলীয় ঐক্য তুলে ধরতে রোববার এল-সায়েদের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা ছিল স্টিভেনসের। তবে প্রতিবেদন অনুযায়ী, এল-সায়েদ তাকে সেখানে না আসতে বলেছিলেন। পরে স্টিভেনস তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে একটি গির্জার অনুষ্ঠানে যোগ দেন।
গির্জার বাইরে রজার্সের পাশে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের স্টিভেনস বলেন, নির্বাচনটি খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। তবে এল-সায়েদ তাকে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে তার প্রচারশিবিরে স্টিভেনসের প্রয়োজন নেই এবং তিনি সেখানে তাকে চান না।
স্টিভেনসের সমর্থন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এল-সায়েদ বলেন, তিনি মিশিগানের মানুষের সমস্যাগুলো নিয়েই মনোযোগ দিতে চান। তার ভাষায়, দিন শেষে আমি হেইলি স্টিভেনসকে নিয়ে ভাবছি না। এসবের কোনো গুরুত্ব নেই।
মঙ্গলবারের (৩ নভেম্বর) মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগানের সিনেট আসনটিকে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকেরা। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে যাবে, তা নির্ধারণে এ আসনের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে আসনটি ডেমোক্র্যাটদের দখলে। অবসর নিতে যাওয়া একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর এ আসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন। ১৯৯৪ সালের পর এই আসনে আর কোনো রিপাবলিকান নির্বাচিত হননি।
তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মিশিগান গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য। ২০২০ সালে রাজ্যটি জো বাইডেনকে সমর্থন করলেও ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হন।
স্টিভেনসের সমর্থনকে স্বাগত জানিয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য স্টিভেনসের সাহস রয়েছে।
আইওয়ায় এক নির্বাচনি সমাবেশে ট্রাম্পও স্টিভেনসের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, আমি হেইলিকে চিনি না, কখনো তার সঙ্গে দেখা হয়নি। কিন্তু তিনি এমন কথা বলেছেন, যা বলার সাহস অনেকের নেই।’ ট্রাম্প আরও বলেন, স্টিভেনস রিপাবলিকান পার্টিতে যোগ দিলে তিনি খুশি হবেন।
এদিকে স্টিভেনসের ঘোষণার পর তার প্রচারশিবিরের বেশ কয়েকজন কর্মী পদত্যাগ করেছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। মিশিগান ডেমোক্র্যাট পার্টির চেয়ারম্যান কার্টিস হার্টেল বলেন, স্টিভেনসের সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে তিনি নিজের কথিত আদর্শ থেকে সরে গেছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, স্টিভেনস ও অসৎ উদ্দেশ্যে কাজ করা অন্যদের মাধ্যমে দলকে বিভক্ত করার এবং নির্বাচনী অগ্রযাত্রা বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করছে ডেমোক্র্যাটরা।
সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমারও রজার্সের প্রতি স্টিভেনসের সমর্থনকে ‘জঘন্য বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে মন্তব্য করেছেন।
ডেট্রয়েট শহরের কেন্দ্রস্থলে বিবিসির সঙ্গে কথা বলা কয়েকজন ডেমোক্র্যাট ভোটার স্টিভেনসের সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন। ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী সামার লরেন্স বলেন, তিনি বিষয়টি বুঝতে পারছেন না। তার মতে, স্টিভেনস যে আদর্শের কথা বলেন, রিপাবলিকান হিসেবে রজার্সের অবস্থান তার সঙ্গে মেলে না।
আরেক ভোটার ম্যাথিউ বারেরা মনে করেন, দলের প্রতি হতাশা থেকেই হয়তো এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন স্টিভেনস।
তবে রজার্সের কয়েকজন সমর্থক মনে করছেন, এই সমর্থন নির্বাচনের ফলাফলে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না। ভোটাররা স্টিভেনসের ক্ষোভের বিষয়টি বুঝতে পারবেন বলেও মন্তব্য করেন রিপাবলিকান সমর্থক মারিসা লি।
স্টিভেনস ও এল-সায়েদের বিরোধ ডেমোক্র্যাট পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নিয়ে মতপার্থক্য সামনে এনেছে। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দলের ভেতরের এই বিভাজন আরও স্পষ্ট হচ্ছে।
মিসরের অভিবাসী পরিবারের সন্তান এবং সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা এল-সায়েদ ওয়াশিংটনের প্রচলিত রাজনীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অসন্তোষকে সামনে এনেছেন। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়েও সমালোচনামুখর তিনি।
অন্যদিকে স্টিভেনস ডেমোক্র্যাটদের মধ্যপন্থী অংশের প্রতিনিধি। প্রাথমিক নির্বাচনে মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমারের মতো দলীয় নেতাদের সমর্থন পেয়েছিলেন তিনি।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে চায় ডেমোক্র্যাটরা। সে জন্য তাদের নিট চারটি আসন বাড়াতে হবে। বর্তমানে নিজেদের দখলে থাকা মিশিগানের আসনটি হারালে দলটির জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হবে। তখন সিনেটে নিয়ন্ত্রণ পেতে পাঁচটি আসন বাড়ানোর প্রয়োজন হবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক