সিনেটে ট্রাম্পের মাথায় হাত, কী কী করতে পারবেন না
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের কাছে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন রিপাবলিকানরা। এর ফলে বিচারক ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিয়োগ, আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদন এবং আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়তে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে তার নির্বাহী ক্ষমতা ও ভেটো দেওয়ার অধিকার বহাল থাকবে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) ফলাফল অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের কাছ থেকে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছে। এর ফলে ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে নতুন কংগ্রেসের অধিবেশন শুরু হলে সিনেটের গুরুত্বপূর্ণ কমিটি ও কার্যসূচির নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে ডেমোক্র্যাটদের হাতে।
এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়বে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে। বিশেষ করে বিচারক নিয়োগ, মন্ত্রিসভার সদস্যদের অনুমোদন, রাষ্ট্রদূত নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে সিনেটের সমর্থন পাওয়া কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত ও শুনানির সুযোগও বাড়বে ডেমোক্র্যাটদের।
তবে সিনেটে পরাজয় মানেই ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা বহাল থাকবে। কিন্তু যেসব সিদ্ধান্তের জন্য সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন, সেগুলো বাস্তবায়নে তাকে বিরোধী দলের সহযোগিতা নিতে হবে।
১. নিজের পছন্দের বিচারক নিয়োগ সহজ হবে না
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে বিচার বিভাগে নিয়োগের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট, ফেডারেল আপিল আদালত ও জেলা আদালতের বিচারক নিয়োগের জন্য প্রেসিডেন্ট মনোনয়ন দেন। কিন্তু এসব নিয়োগ কার্যকর করতে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন।
ডেমোক্র্যাটরা সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় ট্রাম্পের মনোনীত বিচারকদের নিয়োগ আটকে দেওয়া, প্রত্যাখ্যান করা কিংবা অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার সুযোগ পাবে। বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টে কোনো পদ শূন্য হলে নতুন বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অর্থাৎ ট্রাম্প বিচারক মনোনীত করতে পারবেন, কিন্তু নিজের পছন্দের প্রার্থীকে সহজে নিয়োগ দিতে পারবেন না।
২. মন্ত্রিসভা ও গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের নিয়োগে বাধা
যুক্তরাষ্ট্রের মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, রাষ্ট্রদূত এবং বিভিন্ন ফেডারেল সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হয়।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় ট্রাম্পের মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে দেওয়া বা দীর্ঘায়িত করার সুযোগ পাবে তারা। কোনো প্রার্থীকে নিয়ে আপত্তি থাকলে শুনানি, প্রশ্নোত্তর এবং ভোটের মাধ্যমে অনুমোদন বিলম্বিত করা সম্ভব।
এর ফলে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিতে ট্রাম্পকে রাজনৈতিক সমঝোতার পথে যেতে হতে পারে। তবে সব সরকারি পদে নিয়োগের জন্য সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হয় না। কিছু নিম্নপর্যায়ের কর্মকর্তার নিয়োগের ক্ষমতা আইন অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হাতে থাকতে পারে।
৩. আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদনে বাধার মুখে পড়বেন
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট আন্তর্জাতিক চুক্তি করতে পারেন, তবে আনুষ্ঠানিক চুক্তি অনুমোদনের ক্ষেত্রে সিনেটের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি প্রয়োজন।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুমোদন পাওয়া কঠিন হতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা চুক্তির শর্ত নিয়ে আপত্তি তুলতে পারে, অনুমোদন আটকে রাখতে পারে কিংবা প্রয়োজনীয় সমর্থন না দিয়ে সেটিকে কার্যত অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।
তবে সব আন্তর্জাতিক সমঝোতার জন্য সিনেটের অনুমোদন লাগে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অনেক ক্ষেত্রে নির্বাহী চুক্তির মাধ্যমে অন্য দেশের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারেন।
৪. সিনেটের কমিটি ও শুনানির নিয়ন্ত্রণ হারাবেন
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় রিপাবলিকানরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির চেয়ারম্যান পদও হারাবে। নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠ দল এসব কমিটির নেতৃত্ব ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করবে।
এর ফলে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে শুনানি আয়োজন, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশ্ন করা এবং প্রয়োজনীয় নথি তলব করার সুযোগ পাবে।
অভিবাসননীতি, শুল্ক, পররাষ্ট্রনীতি, সরকারি ব্যয়, প্রশাসনের কর্মকাণ্ড কিংবা ট্রাম্পের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তদন্ত হতে পারে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কংগ্রেসের সামনে জবাবদিহি করতে হতে পারে।
তবে সিনেটের তদন্ত ক্ষমতা থাকলেও প্রতিটি তদন্তের ফলেই প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্ত বাতিল হয়ে যাবে, এমন নয়।
৫. নিজের পছন্দের আইন পাস করানো কঠিন হবে
যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সাধারণ বিল আইনে পরিণত হতে হলে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- দুই কক্ষেই অনুমোদন পেতে হয়। এরপর সেটি প্রেসিডেন্টের কাছে স্বাক্ষরের জন্য পাঠানো হয়।
সিনেটে ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় ট্রাম্পের নীতিগত অগ্রাধিকার অনুযায়ী বিল পাস করানো কঠিন হবে। ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের পছন্দের বিল সামনে আনতে পারবে এবং রিপাবলিকানদের প্রস্তাবিত বিল আটকে দিতে পারবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সিনেটে সাধারণ আইন নিয়ে বিতর্ক শেষ করে ভোটে যেতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ৬০ ভোটের সমর্থন প্রয়োজন হয়। ফলে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই ডেমোক্র্যাটরা সব ধরনের আইন সহজে পাস করাতে পারবে না।
অন্যদিকে ট্রাম্পের হাতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। অর্থাৎ ডেমোক্র্যাটরা কোনো বিল পাস করালেও ট্রাম্প সেটিতে ভেটো দিতে পারবেন। সেই ভেটো অতিক্রম করতে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন।
৬. অভিশংসনের বিচারপ্রক্রিয়ায় ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ বাড়বে
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় ডেমোক্র্যাটদের হাতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য অভিশংসন প্রক্রিয়ার বিচারপর্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি- প্রেসিডেন্টকে অভিশংসনের অভিযোগে অভিযুক্ত করার ক্ষমতা সিনেটের নয়, প্রতিনিধি পরিষদের।
প্রতিনিধি পরিষদ সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অভিশংসনের অভিযোগ অনুমোদন করলে সিনেটে বিচার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রেসিডেন্টকে দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে সরাতে উপস্থিত সিনেটরদের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন।
অর্থাৎ সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও শুধু সেই কারণে ট্রাম্পকে পদ থেকে সরানো সম্ভব নয়। অভিশংসনের বিচার হলে তাঁকে অপসারণ করতে প্রয়োজন হবে আরও বড় ধরনের সমর্থন।
৭. প্রতিরক্ষা ও যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বাড়তে পারে নজরদারি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। ফলে সামরিক বাহিনীর দৈনন্দিন পরিচালনা ও অনেক সামরিক সিদ্ধান্তে তার নির্বাহী ক্ষমতা রয়েছে।
তবে যুদ্ধ ঘোষণা, সামরিক ব্যয় অনুমোদন এবং সামরিক কার্যক্রমের ওপর কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ভূমিকা রয়েছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ডেমোক্র্যাটরা প্রতিরক্ষা বাজেট, সামরিক অভিযান এবং প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে শুনানি ও তদন্ত বাড়াতে পারে।
এতে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক ও পররাষ্ট্রনীতির ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়বে। তবে সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেই প্রেসিডেন্টের কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক