টিকিট কেটে ঢুকতে হচ্ছে কমলা বাগানে, ভিড় করছেন হাজারো মানুষ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে চায়না-থ্রি জাতের কমলার চাষ করে সাড়া ফেলেছেন প্রবাসফেরত যুবক আলমগীর মিয়া। দীর্ঘ ১৭ বছর প্রবাস জীবন শেষ করে দেশে এসে জঙ্গলের মাঝে দুই বিঘা জমি লিজ নিয়ে ইউটিউব দেখে শুরু করেন কমলা চাষ। একসময় যে জমিতে মানুষ থাকত আতঙ্কে, এখন প্রতিদিন বিকেলে সেখানে মানুষের ভিড় জমে কমলা বাগান দেখতে। বাগানে ঢুকতে দর্শনার্থীদের টিকিটপ্রতি গুনতে হচ্ছে ২০ টাকা। এ নিয়ে এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।
উপজেলার বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের দুলালপুর গ্রামের এই কমলা বাগান দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে হাজারো মানুষ ভিড় করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর থেকেই বাগানটি পরিণত হয়েছে এক নতুন দর্শনীয় স্থানে।
‘ফলের রাজ্য’ হিসেবে পরিচিত বিজয়নগর উপজেলায় আগে থেকেই আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, লটকন, মাল্টা ও পেয়ারার মতো নানা মৌসুমি ফলের চাষ হয়ে আসছে। মাল্টার পর এখন নতুন সংযোজন হয়েছে চায়না কমলা, যা কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কমলা বাগানকে ঘিরে বাগানের আশপাশে গড়ে উঠেছে ফুচকা, পিঠা, ঝালমুড়ি, ভাজাপোড়া ও চায়ের বেশকিছু অস্থায়ী দোকান। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিদিন এসব দোকানে বিক্রি হচ্ছে প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার পণ্য, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জানা গেছে, প্রবাসফেরত যুবক মো. আলমগীর ভূঁইয়া পাঁচ বছর আগে মাত্র দুই বিঘা জমি ১৬ বছরের জন্য বর্গা নিয়ে ইউটিউব দেখে চায়না-থ্রি জাতের কমলার চাষ শুরু করেন। রোপণের দুই বছরের মধ্যেই ফলন পেতে শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তার বাগানে ১৮০টি গাছে ঝুলছে ছোট ছোট হলুদ রঙের দৃষ্টিনন্দন কমলা।
দেখতে আকর্ষণীয় চাইনিজ কমলার মতোই সুস্বাদু হওয়ায় মুহূর্তেই এসব কমলার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে। ফলে প্রতিদিনই বাগানে ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও বানাচ্ছেন, কেউ আবার ঝুলন্ত কমলা দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন। অনেক জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর এই কমলা বাগানে এসে কনটেন্ট তৈরি করছেন।
কৃষক আলমগীর ভূঁইয়া জানান, শুরুতে এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ তাকে এই কমলা চাষে নিরুৎসাহিত করেছিল। তবে তিনি দৃঢ় মনোবল নিয়ে মাত্র চার লাখ টাকা পুঁজি বিনিয়োগ করে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি সফলতার মুখ দেখছেন। চলতি মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে তার বাগানে শুরুর দিকে কিছু ফল ঝরে পড়েছে। তারপরও দুই মেট্রিকটন কমলা উৎপাদনের আশা করছেন, যার বাজারমূল্য প্রায় আট লাখ টাকা।
বাগানে প্রবেশের জন্য টিকিট চালুর বিষয়ে চাষি আলমগীর বলেন, ‘শুরুতে আমার বাগান সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। মানুষ নিজের মতো করে কমলা পেড়ে খেত বা নিয়ে যেত। কিন্তু পরে অনেকেই বিনা অনুমতিতে গাছ থেকে ফল পেড়ে ফেলে। গাছের ক্ষতি হওয়ায় বাধ্য হয়ে ২০ টাকা টিকিট চালু করেছি। এখন সবাই ছবি ও ভিডিও করতে পারবেন, তবে গাছ থেকে নিজের হাতে কমলা পাড়া নিষেধ।’
আলমগীর আরও জানান, আগে কমলা বিক্রি হতো কেজিপ্রতি ২২০ টাকা। টিকিট চালুর পর দর্শনার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে তিনি দাম কমিয়ে কেজিপ্রতি ২০০ টাকা করে বিক্রি করেছেন।
এদিকে, কমলা বাগানকে কেন্দ্র করে প্রতিদিনই এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশ। স্থানীয়দের দাবি, চায়না কমলার এই সাফল্য বিজয়নগরের কৃষিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এবং অন্য কৃষকরাও এতে উৎসাহিত হবেন।
এ বিষয়ে বিজয়নগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জিয়াউল ইসলাম বলেন, বিজয়নগরের দুজন কৃষক তিন বিঘা জমিতে কমলার আবাদ করেছেন। বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের দুলালপুরে কৃষক আলমগীর মিয়ার দুই বিঘা ও ছতরপুর গ্রামের কৃষক খোকন মিয়ার এক বিঘা। এবার দুই মেট্রিক টনের বেশি কমলা উৎপাদন হবে, যার বাজার মূল্য প্রায় আট লাখ টাকা।

শাহনেওয়াজ শাহ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া (সদর-আশুগঞ্জ-বিজয়নগর)