বৈঠকটি গোপন রাখতে অনুরোধ করেছিলেন ভারতীয় কূটনীতিক : জামায়াত আমির
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, চলতি বছর তার বাইপাস সার্জারি হওয়ার পর তিনি একজন ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। তবে ওই কূটনীতিক তাকে বৈঠকটি গোপন রাখতে অনুরোধ করেছিলেন। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি একসময়ে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। ইসলামপন্থি এ দলটি আসন্ন ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনে তাদের সবচেয়ে ভালো ফলাফল পাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমনকি দলটি ঐক্যের সরকারে যোগদানের জন্যও প্রস্তুত বলে জানিয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি দলের সঙ্গে আলোচনা করেছে দলটি।
জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ১৭ বছরে এবারই প্রথম কোনো নির্বাচনে অংশ নিতে যাওয়া জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ঠিক পরই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। এটি দলটির জন্য ১৭ কোটি ৫০ লাখ মুসলিম অধ্যুষিত এদেশে মূলধারার রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত।
আরও পড়ুন : পাকিস্তানের স্পিকার ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর শুভেচ্ছা বিনিময়
জামায়াতে ইসলামী সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ক্ষমতার অংশীদার হয়েছিল। আবারও দলটি তাদের সঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে উন্মুক্ত।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান তার বাসভবনে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা কমপক্ষে পাঁচ বছরের জন্য একটি স্থিতিশীল দেশ দেখতে চাই। যদি দলগুলো একত্রিত হয়, আমরা একসঙ্গে সরকার পরিচালনা করব।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াত শরিয়া আইনের ভিত্তিতে ইসলামী শাসনব্যবস্থার পক্ষে, তবে তারা তাদের রক্ষণশীল ভিত্তির বাইরেও দলের আবেদন সম্প্রসারিত করার চেষ্টা করেছে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান যেকোনো ঐক্য সরকারের জন্য যৌথ এজেন্ডা হওয়া উচিত।
জামায়াত আমির আরও বলেন, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সর্বাধিক আসনে জয়ী দল থেকেই প্রধানমন্ত্রী হবে। যদি জামায়াত সর্বাধিক আসনে জয় পায়, তাহলে তার দল সিদ্ধান্ত নেবে—তিনি প্রধানমন্ত্রী হবেন কিনা।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে তরুণদের নেতৃত্বাধীন এক গণঅভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান ঘটে। হাসিনার দল আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে নিষিদ্ধ। তিনি জামায়াতের একজন তীব্র সমালোচক ছিলেন এবং তার শাসনামলে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে দলটির বেশ কয়েকজন নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
আরও পড়ুন : প্রধান উপদেষ্টা সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন পাকিস্তানের স্পিকার
২০১৩ সালে একটি আদালত জামায়াতের নিবন্ধন সনদ দেশের সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন করে বলে রায় দেন এবং এরপর তাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার দলটির ওপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়।
ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ঢাকা থেকে পালিয়ে হাসিনার ভারতে অবস্থানের বিষয়টি উদ্বেগের। তার পতনের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, নয়াদিল্লি বাংলাদেশে পরবর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করতে পারে এমন দলগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। জামায়াত আমির এ বছর তার বাইপাস সার্জারি সম্পন্নের পর একজন ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অন্যান্য দেশের কূটনীতিকরা তার সঙ্গে খোলামেলা সৌজন্য সাক্ষাৎ করে থাকেন, কিন্তু ভারতীয় কর্মকর্তা তার ওই সাক্ষাতের বিষয়টি গোপন রাখতে অনুরোধ করেছিলেন।
জামায়াত আমির বলেন, ‘কেন? অনেক কূটনীতিক আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন এবং এটি প্রকাশিত হয়েছিল। সমস্যাটা কোথায়? আমাদের সবার জন্য এবং একে অপরের জন্য উন্মুক্ত হতে হবে। আমাদের সম্পর্ক উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই।’
বৈঠকের বিষয়টি গোপন রাখার অনুরোধ করা নিয়ে শফিক রহমানের মন্তব্যের বিষয়ে রয়টার্স যোগাযোগ করলেও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে ভারত সরকারের একটি সূত্র তাদের বিভিন্ন দলের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বুধবার ঢাকা সফর করে সদ্য প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। খালেদা জিয়া গত মঙ্গলবার মারা যান।
আরও পড়ুন : আধিপত্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে খালেদা জিয়ার অবদান স্মরণীয় : জামায়াত আমির
পাকিস্তানের সঙ্গে জামায়াতের ঐতিহাসিক ঘনিষ্ঠতা সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সবার সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখি। আমরা কখনই কোনো একটি দেশের দিকে ঝুঁকে পড়তে আগ্রহী নই। আমরা সবাইকে সম্মান করি এবং দেশগুলোর মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চাই।’
শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতকে নিয়ে কোনো সরকার গঠিত হলে সেটি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে কাজ করতে ‘স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে না’। তিনি ২০২৩ সালে আওয়ামী লীগের সমর্থনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।
রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চলতি মাসে এক সাক্ষাৎকারে রয়টার্সকে বলেছেন, তিনি তার মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে পদত্যাগ করতে চান।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) রয়টার্সের সঙ্গে ফোনালাপে মো. সাহাবুদ্দিন জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের অবস্থান নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, তিনি ‘বিষয়টি আরও জটিল করতে চান না’।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক