কেন প্লেব্যাক না করার সিদ্ধান্ত নিলেন অরিজিৎ সিং?
খ্যাতির শিখরে থেকে প্লেব্যাক থেকে অবসর নিলেন অরিজিৎ সিং। পরিচিতদের মতে, আরো বেশি সংগীত চর্চা করাই তার লক্ষ্য। জিয়াগঞ্জে ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন, হাত নাড়ছেন আমির খান। অরিজিৎ সিং-এর বাড়িতে চলছে নতুন গানের রেকর্ডিং। সাংবাদিক, নিরাপত্তারক্ষী, সামান্য দেখা পাওয়ার জন্য উন্মুখ জনতায় গমগম করছে জিয়াগঞ্জ।
ভাগীরথীর তিরের মুর্শিদাবাদের এই ছোট মফস্বল শহর তবু নিরুত্তাপ। সেলিব্রিটি দেখতে অভ্যস্ত তারা। এই ছোট শহরের ‘পাড়ার ছেলে’ অরিজিতের দৌলতে কখনো এড শিরান বা কখনো বাদশা-র সঙ্গে দেখা হয়েছে তাদের। তাদের পাড়ার ছেলে সমু (অরিজিতের ডাকনাম) যে তাদের থেকে কম বিখ্যাত নন এ কথা খুব ভালো জানেন তারা। কিছুদিন আগেই গ্র্যামিজয়ী এড একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, অরিজিৎ-এর ‘তুম হি হো’ গানটি তাকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি যেমন অরিজিতের শহরে এসে ‘স্যাফায়ার’ শুট করলেন, যুক্তরাজ্যেও একে অপরের কনসার্টে ঢুকে পড়েন স্বচ্ছন্দে। এই পাড়ায় ব্যাডমিন্টন খেলেছেন সেলিম মার্চেন্টও। 'সুকুন'-এর রেকর্ড করেছেন এখানে।
জমজমাট জিয়াগঞ্জ
এখন জিয়াগঞ্জ ফের জমজমাট। খ্যাতির শিখরে থেকেই অবসরের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন কতজন? শিখরে থাকতে থাকতে হঠাৎই সিনেমার গানকে বিদায় জানিয়েছেন অরিজিৎ। জানিয়েছেন, নতুন কিছু করবেন। তবে তার আগে কথা দিয়ে রাখা কাজ শেষ করে তবে প্লেব্যাক ছাড়বেন তিনি। সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গে এখন সেলিব্রিটির ঘনঘটা। কিছুদিন আগেই বিশাল ভরদ্বাজের সঙ্গে গান রেকর্ড করেছেন। এখন আমির খানের সিনেমার গান রেকর্ড করার কথা। বিশাল অবশ্য অরিজিতকে তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে বলেছেন।
সেই অনুরোধ করেছেন অনেকেই। তবে যারা শান্ত, ধীর এই অরিজিৎ-কে এতটুকুও চেনেন, তারা মনে করেন, ভেবে চিন্তেই মনস্থির করেছে। তার বদল হওয়া মুশকিল।
কেন ছাড়লেন? রাগ করে ছাড়লেন কিনা? অতঃপর রাজনীতিতে যোগ দেবেন কিনা, তা নিয়ে চর্চার শেষ নেই। তবে গায়কের ঘনিষ্ঠদের মতে, আরো বড় স্বপ্ন নিয়ে অনেকদিন ধরে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন অরিজিৎ। সিনেমার গানের বাইরেও যে সংগীতের একটা বিশাল দুনিয়া আছে, তাতেই মন দেবেন তিনি, এমনটাই আশা তাদের।
সংবাদমাধ্যম এড়িয়ে চলেন অরিজিৎ। ফলে তার ঘনিষ্ঠ মানুষজনও তার সম্পর্কে মিডিয়ার সামনে মুখ খুলতে চান না। তেমনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গায়ক-ঘনিষ্ঠ ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘ওর যখন সবে নাম ডাক হচ্ছে তখনই ও বিদেশি এক গায়ককে দেখিয়ে বলেছিল, তার মতন বছরে কয়েকটা শো করবে। নিজের মতো করে সংগীত চর্চা করবে। প্লেব্যাক ছেড়ে অন্য কিছু করবে সেই ইঙ্গিতও ও দিয়েছে অনেকবার। তবে এত তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নেবে, আমরাও ভাবিনি।’
‘সংগীত অরিজিতকে ছাড়বে না’
প্রায় দুই দশক আগে সুরকার জয় সরকারকে অ্যাসিস্ট করতে চেয়েছিলেন অরিজিৎ। সেই স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে জয় বললেন, ‘‘তখন ওর ঝাঁকড়া, বড় চুল। আমার কাছে একটা ল্যাপটপ নিয়ে এলো। উজ্জ্বয়িনীর (মুখোপাধ্যায়) গাওয়া একটা রবীন্দ্রসংগীতের সঙ্গে ও পিয়ানো বাজিয়েছিল। সেটা শুনে আমি ওর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম। ও এসে আমার এমন সব গানের কথা মনে করাল যা আমিই ভুলে গেছিলাম। ওই ল্যাপটপে ওর বানানো মিউজিক শোনালো। ও আমাকে অ্যাসিস্ট করতে চাইলো। আমার তো কোনোদিনই সহযোগীর প্রয়োজন হয়নি। আমাদের তখন একসঙ্গে কাজ করা হলো না।’’
পরে অবশ্য জয়ের সুরে গান গেয়েছেন অরিজিৎ। সম্প্রতি শ্রীজাত নির্দেশিত মানবজমিনে রামপ্রসাদী ‘মন রে কৃষিকাজ’ জানো না গেয়ে শ্রোতাদের মন জয় করেন অরিজিৎ।
জয়সহ অন্যান্য অনেকের মতেই অরিজিৎ কেবলমাত্র একজন গায়ক নন-একজন সর্বাঙ্গীন সংগীতশিল্পী। সিনেমার গান থেকে অবসর নিলেও সংগীত থেকে কোনো মতেই ছুটি নিচ্ছেন না তিনি, এ কথা স্পষ্ট করেছেন গায়কের ঘনিষ্ঠ সকলেই। নিজের প্রতিটি গিটারের একটা করে নাম রাখেন তিনি -যেন তারা পরিজন।
ফেম গুরুকুলে অংশ নেয়ার সময় একাধিক উঠতি বাঙালি গায়ক-গায়িকারা দল বেঁধে আড্ডা মারতেন, গান বাজনা করতেন। অরিজিতের সঙ্গে সেই সময় পরিচয় উজ্জ্বয়িনীর। তিনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘একটা গান যে নিজে গেয়ে, আরেঞ্জ করে সংগীত প্রডিউস করা যায় তা আমরা কেউ জানতাম না। ও জানতো। স্বভাবে মুখচোরা হোলেও একবার পরিচিত হলে অনেক আড্ডা মারত। বিশেষ করে গান বাজনার আড্ডা হলে তো কথাই নেই। সেই সময় যার মা মুম্বই যেতেন তার বাড়িতেই খাওয়া দাওয়া হতো। আমার মায়ের হাতের রান্না খেতে পছন্দ করত। ও অনেক বিখ্যাত হওয়ার পরেও মানুষটা একই রকম থেকে গেছে।’
জয়ের মতে, ‘অরিজিৎ এমন অনেক কিছু পারেন যা অনেকে পারেন না। যেমন, খ্যাতি আলো থেকে দূরে সরে এসেও খ্যাতির শিখরে থাকতে পারেন তিনি। খ্যাতির তুলনায় নিজের সংগীতকে বেশি গুরুত্ব দিতে জানেন অরিজিৎ। তিনি খ্যাতির পিছনে দৌড়ন না। তাই খ্যাতিও তার পিছু ছাড়ে না।’
যত্নে বোনা জিয়াগঞ্জ
নিজের চারপাশে খুব যত্ন করে সৃজনশীল বলয় তৈরি করেছেন তিনি। সিনেমা বানিয়েছেন। নিজে পায়ে হেঁটে সেই সিনেমা শুটিং-এর আগে রেইকি করেছেন। তার এক ঘনিষ্ঠ বলেন, ‘অনেক আগে থেকেই সিনেমা বানানোর কথা বলতেন। কিন্তু এ কথাও স্পষ্ট করে দিতেন যে সিনেমা সে দর্শকদের জন্য নয়, নিজের জন্য বানাবেন। বলতেন, ‘ভালো সিনেমা হলে দর্শক এমনই দেখবেন।’
জিয়াগঞ্জ অঞ্চলে সাধারণ মানুষের জীবনে অরিজিতের নিঃশব্দ বিচরণ। এনজিও চালান। নাম, তত্ত্বমসি ফাউন্ডেশন। হাসপাতাল তৈরি করছেন। কোভিডে মাকে হারিয়েছেন অরিজিৎ। তার স্মৃতিতে তৈরি অদিতি সুরসাধনালয়ে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা আবাসিকও থেকে গান বাজনা চর্চা করতে পারেন। পাড়ার মাঠে মায়ের স্মৃতিত উদ্দেশ্যে খেলাধুলা চর্চা কেন্দ্র বানিয়েছেন। অঞ্চলে ক্লাসিক্যাল সংগীতের আয়োজন করেন। কেউ সাহায্যও চাইলে ফেরান না।
তার সবটুকুতেই জিয়াগঞ্জের হাতছানি। তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জানান, ‘মুম্বাইতে থাকার সময়েও মাঝেমধ্যেই উধাও হয়ে যেতেন গায়ক। বেশ কিছুদিন পরে খবর নিয়ে দেখা যেত, জিয়াগঞ্জে ফিরে এসেছেন তিনি। আবার যেতেন মুম্বাইতে।’
শিকড়ের টানে বার বার ফিরে এসেছেন তিনি। প্লেব্যাক জগতে অবিসংবাদী রাজা হয়েও মুম্বাই থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে জিয়াগঞ্জে ফিরে এসে বিশ্বমানের স্টুডিও বানিয়েছেন। দেশের বিখ্যাত সুরকাররা তার বাড়িতে আসেন রেকর্ড করতে। মুম্বাইয়ের একাধিক বাড়ি, বাহুল্য, এমনকী বহুমূল্যের সাইকেলটিকেও ছেড়ে ছোট শহরে স্কুটি নিয়ে ঘুরে বেড়ান। তিনি সংগীত তৈরি করেন। ছবি আঁকেন। ব্যাডমিন্টন খেলেন। দুই ছেলে জুল এবং আলি স্থানীয় স্কুলে পড়াশোনা করেছেন।
অরিজিৎ আজও পরিচিতদের সঙ্গে আড্ডা মারেন। পাড়ার দোকানে চা খান। তবে যখন তখন সেলফি তুলতে দেন না। দেশের এক নম্বর প্লেব্যাক সিঙ্গার হয়েও নিজের শিকড়ের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখেছেন তিনি। বাবা এবং অন্যান্য পরিজন সামান্য একটা ভাতের হোটেল চালান। নাম হেঁশেল। ছাত্রছাত্রীরা এখনো ৪০ টাকায় পেট ভরে ভাত খেতে পারেন। ক্যাশ কাউন্টারের পিছনে হাতে আঁকা একটি অরিজিতের স্কেচ। এই দোকানে আর এমন কিছু নেই যাতে আরজিতের খ্যাতি প্রকাশিত হয়।
অরিজিতের এই জীবনবোধ আকর্ষণ করে সুরকার এবং বাংলা ব্যান্ড চন্দ্রবিন্দুর গায়ক উপল সেনগুপ্তকে। ডয়চে ভেলেকে তিনি জানান, ‘আমি অরিজিতকে ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তবে দেখেছি, খ্যাতি, যশ, মিডিয়ার চাপ বা পিআর- এসব কোনো কিছুকেই ও তোয়াক্কা করে না। নিজের জীবনকে নিজে নিয়ন্ত্রণ করে। আমার মতে, একজন শিল্পীর ঠিক এমনটাই তো হওয়ার কথা।’
বলিউডের মোহময়ী দুনিয়ার থেকে তার সংগীত সৃষ্টির উন্মাদনা, জিয়াগঞ্জের মাটির গন্ধ যে আরো অনেক আকর্ষনীয় সেই স্বাদ তিনি পেয়েছিলেন আগেই। আসলে অরিজিৎ ছাড়তে জানেন। তিনি জানিয়েছেন, প্লেব্যাক নয়, ইন্ডিপেন্ডেন্ট সংগীত নিয়ে কাজ করতে চান। যে শিল্পী সৃষ্টিতে তার স্বাধীনতা খুঁজে পান খ্যাতি তাকে আটকে রাখতে পারে না, বারবার সেইটাই প্রমাণ করে চলেন অরিজিৎ সিং।

ডয়চে ভেলে