ধূমপানে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্বাসনালি ও ফুসফুস

ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি বেশ জটিল রোগ। এই রোগের অন্যতম কারণ ধূমপান। আজ ১৮ মে এনটিভির স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ২০৪৯তম পর্বে এ বিষয়ে কথা বলেছেন বারডেম হাসপাতালের মেডিসিন ও বক্ষব্যাধি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম দেলোয়ার হোসেন।
প্রশ্ন : সিওপিডি বিষয়টি কী?
উত্তর : সিওপিডি রোগে শ্বাসনালি ও ফুসফুসের প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটা একবার হলে আর ভালো হয় না। সিওপিডিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফুসফুস ও শ্বাসনালি। ফুসফুসের যে অংশে বাতাস এবং গ্যাস এক্সচেঞ্জ হয় অক্সিজেন এবং কার্বন-ডাই অক্সাইড শরীরের বাইরে- ভেতরে রক্তে যায় এবং ফুসফুসে থাকে সেই জায়গাটা নষ্ট হয়ে যায় , কার্যকারিতা কমে যায়, একে এমফোয়সিমা বলে। আরেকটি হলো, ব্রঙ্কাইটিস। সিওপিডি আসলে দুটো জিনিস নিয়ে হয় ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস এবং এমফয়সিমা। আমরা যখন দেখি তিন মাস একনাগারে কাশি আছে, কফ পড়ছে বেশির ভাগ সময় এবং এটা যদি পর পর দুই বছর হয় তখন আমরা ক্রনিক বঙ্কাইটিস বলি। আরেকটি যেটা আছে এমফয়সিমা এটা সাধারণত বড়দের হয়। ৪০ বছরের পরের লোকদের এটা হয়। এখানে কাশি এবং কফের চেয়ে শ্বাসকষ্ট বেশি থাকে। অল্পতেই রোগী হাপিয়ে পড়ে।
ফুসফুসের যেই জায়গায় অক্সিজেন এবং কার্বন ডাই অক্সাইড পরবির্তিত হয় সেই জায়গাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে রোগীরা শ্বাসকষ্টে বেশি ভোগে। তার মনে হবে প্রচুর বাতাসের মধ্য থেকেও তার যেন বাতাস নেই। কারণ সে বাতাস ভেতরে নিতে পারছে না।
সিওপিডি বা এমফোয়সিমা যাদের থাকে তাদের ফুসফুসটা বড় হয়ে যায়। তার জন্য এই বাতাস ঢুকতে অনেক কষ্ট হয়। শ্বাস নিতে অনেক কষ্ট হয়।
প্রশ্ন : সিওপিডি রোগের উপসর্গগুলোতে অ্যাসমা রোগীদের বেলায় শুনতে পাই সেটা যে সিওপিডি সেটা বোঝার উপায় কী?urgentPhoto
উত্তর : কী কী কারণে এই কাশিগুলো হয় আসুন সেটা জানি। অ্যাজমা , ব্রঙ্কাইটিস একটা রোগ আছে এর জন্য হয়। ক্রনিক হার্ট ডিজিজ, হার্ট ফেইলিউর যেটা আছে সেখানেও মানুষের শ্বাসকষ্ট হতে পারে। এখানে রোগের ইতিহাস নিই তারপর কিছু ক্লিনিক্যাল পরীক্ষা করি। তারপর কিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষা করে আমরা এগুলো সাধারণত নির্ণয় করে থাকি। তবে রোগীর ইতিহাসটা আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। যাদের সিওপিডি হয় তাদের ৯৫ ভাগ লোকের সিগারেট খাওয়ার ইতিহাস আছে। সিগারেট ছাড়া সিওপিডি সাধারণত হয় না। এটা ধীরে ধীরে রোগকে বাড়িয়ে তোলে।
প্রশ্ন : আপনি শুরুতে বলছিলেন এটি দীর্ঘ মেয়াদি। ক্রনিক এবং স্থায়ী। একবার হলে সেটা আর আগের অবস্থায় আসে না। এটা নিয়ন্ত্রণ করে চলতে হবে। এটি নিয়ন্ত্রণের জন্য কী চিকিৎসা নিতে হবে?
উত্তর : এর দুটো পথে আমরা চিকিৎসা করি। একটা হচ্ছে তার কষ্ট কমিয়ে দিতে হবে। রোগের বৃদ্ধিটাকে ধীর গতির করে দিতে হবে। আমরা বলেছি সিগারেট খেলে এটা বেড়ে যায়। সিগারেট যদি ব্ন্ধ করে দিতে পারি তাহলে এই রোগের বৃদ্ধিটা কমে যাবে। আরো ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা যাবে। সিগারেট ছাড়া অন্য ধোঁয়া রয়েছে যেমন, লাকড়ির চুলা ব্যবহার করলে সেটি থেকেও সমস্যা হতে পারে। সেটাকে ওখান থেকে বন্ধ করতে হবে। দুই হচ্ছে রোগীর কষ্ট কমিয়ে দেওয়া। কষ্ট কমার জন্য কিছু ওষুধ ব্যবহার করে তার শ্বাসকষ্ট দূর করা হয়।
এই ধরনের রোগগুলো যখন হয় তখন ফুসফুসের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে সবচেয়ে বেশি যা হয় সেটি হলো নিউমোনিয়া। প্রতিবার নিউমোনিয়া হলে ফুসফুস আরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ জন্য প্রতিবার রোগীকে নিউমোনিয়ার ভ্যাকসিন নিতে হবে। যাতে এই নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত না হয়। দুইটা ভ্যাকসিন আমরা সাধারণত দিয়ে থাকি নিউমোককটাল ভ্যাকসিন, প্রতি পাঁচ বছর পরপর দিতে পারি এবং ফ্লু ভ্যাকসিন, প্রতি বছরে একবার করে দিতে পারি। তাহলে এই নিউমোনিয়া না হলে এটার ক্ষতি কম হবে।
প্রশ্ন : এ রকম কাশি হলে অনেক সময় রক্ত পড়ে। তখন মানুষের মনে ভয় জাগে যক্ষা হলো কি না। যক্ষার সঙ্গে এই রোগের পার্থক্য কী?
উত্তর : যক্ষা একটা সংক্রমণ। যক্ষা হলে কিছু উপসর্গ থাকে, জ্বর থাকে। বিকেলের দিকে জ্বর হয় স্বল্প মাত্রায়। রাতে ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে দেয়। যদি ফুসফুসে হয় তার কাশি থাকে। এই জ্বরটা সাধারণত তীব্র হয় না। কাশির সাথে কফ হয়। ক্ষুধা কমে যায়। ওজন কমে যায়। রোগীর দুর্বল লাগে। এটি সাধারণত সিওপিডিতে হয় না। সিওপিডিতে কাশি হয়, শ্বাস কষ্ট হয়, জ্বর সাধারণত হয় না।
প্রশ্ন : রোগীটি যেহেতু একেবারে ভালো হয় না। তাই প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া দরকার। প্রতিরোধের পরামর্শ কী?
উত্তর : প্রথমত, ধূমপান বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধূমপান বন্ধ করতে হবে। তৃতীয়ত, ধূমপান বন্ধ করতে হবে। এটা বন্ধ না করলে ফুসফুসের ক্ষতি হওয়া বন্ধ হবে না।
প্রশ্ন : ধূমপান ছাড়া অন্য কোনো জীবন যাপনের পরিবর্তন আছে কী?
উত্তর : আমাদের দেশে অনেক নারী সিগারেট খান না। তারপরও তাদের সিওপিডি হচ্ছে। সেটা দেখা যাচ্ছে গ্রামে-গঞ্জে সিগারেট খাচ্ছে না। তামাক খাচ্ছে না তবে চুলার যে ধোঁয়াটা এটা যখন তাদের ফুসফুসে ঢোকে তখন এই সমস্যা হয়। সেই ক্ষেত্রে চুলা ব্যবহার থেকে দূরে থাকতে হবে।
প্রশ্ন : পরোক্ষ ধূমপায়ী বলে একটি বিষয় আছে। বলা হয় যারা ধূমপান করে এবং তাদের কাছাকাছি থাকে তারাও সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হোয়। সিওপিডির জন্য পরোক্ষ ধূমপান কোনো ভূমিকা রাখে কি না?
উত্তর : অবশ্যই রাখে। অনেকে মনে করে আমি তো সিগারেট খাই না আমার কেন এই সমস্যা হবে। ১০০ জন যদি সিগারেট খায় শতকরা পাঁচজনের এই সমস্যা হতে পারে। বিশেষ করে তার পরিবারের লোকজন যারা আছে তাদের ক্ষেত্রে। বাসায় যদি কেউ খায় অন্য সদস্যদেরও সিওপিডিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। তবে সিগারেট খাওয়ার যেই বিষয়টা আমাদের জানা দরকার কতদিন ধরে সিগারেট খাচ্ছে এবং কী পরিমাণ সিগারেট খাচ্ছে এর সাথে একটি সম্পর্ক আছে।
প্রশ্ন : কী সম্পর্ক?
উত্তর : সম্পর্ক হচ্ছে যে যত আগে থেকে সিগারেট খাওয়া শুরু করবে সে সাধারণত সিগারেট বেশি খায়। ১৫ বছর থেকে যে শুরু করেছে আর যে ৩০ বছর থেকে শুরু করেছে। তার তো সময়ের পার্থক্য হবেই, ১৫ বছর তার এমনিতেই কমে গেল।
আরেকটি হচ্ছে কতটুকু খাচ্ছে। সাধারণত একজন মানুষ যদি দৈনিক ২০টা করে সিগারেট খায় তবে বছরে আমরা তাকে বলি ওয়ান প্যাক অব ইয়ার। সিওপিডি হতে সাধারণত ২০ প্যাক অব ইয়ার লাগে। প্রতিদিন ২০টা করে ২০ বছর ধরে খেলে সে অত্যন্ত ঝুঁকি প্রবণ।