ডায়াবেটিসের সঙ্গে কিডনি রোগের সম্পর্ক কী?
ডায়াবেটিস একটি জটিল রোগ। এটি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে দেহের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এনটিভির নিয়মিত আয়োজন স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ২৪৩১তম পর্বে এ বিষয়ে কথা বলেছেন অধ্যাপক শামীম আহম্মেদ। তিনি জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটের কিডনি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ছিলেন।
প্রশ্ন : ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগ দুটির মধ্যে সম্পর্ক কী?
উত্তর : আমাদের দেশে ডায়াবেটিস রোগটি এখন এপিডেমিক অবস্থায় দেখা দিচ্ছে। ডায়াবেটিস চোখ, হৃৎপিণ্ড, কিডনি, রক্তনালি প্রতিটি অঙ্গকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আমাদের যে ক্রনিক কিডনি ফেইলিউর বা ক্রনিক রেনাল ফেইলিউর হয়, এর প্রধান কারণ হিসেবে এখন ধরা হয় ডায়াবেটিস।
এখন এই রোগটি কেন এত বেশি আমাদের দেশে দেখা যায়? এর একটি কারণ হলো যারা কায়িক পরিশ্রম করছে না, ঘরে বসে থাকছে, কোনো ব্যায়াম করছে না, তাদের ডায়াবেটিসের সমস্যা হতে পারে। এটি একটি কারণ। দ্বিতীয় কারণ হলো, বংশগত। জন্মগতভাবে এটি ট্রান্সফার হয়ে থাকে।
এখন এই ডায়াবেটিস কিডনির রোগ আমরা কীভাবে ধরতে পারব? গবেষণা করা দেখা গেছে ডায়াবেটিস ও কিডনির রোগ পাঁচটি স্তরে পাওয়া যায়। প্রথম যখন ডায়াবেটিস ধরা পড়ে, রক্তের সুগার বেড়ে যাবে এবং কিডনিতে রক্তের প্রবাহ বেড়ে যায়। তাতে কিডনির আকারও বেড়ে যায়। ডায়াবেটিসের প্রথম পর্যায়ে এমন হয়। এভাবে চার থেকে পাঁচ বছর যাবে।
এরপর হলো দ্বিতীয় পর্ব। ধরেন ১০০ জনের ডায়াবেটিস আছে, ৫০ জন এর পরের পর্যায়ে যাবে। এরপর তৃতীয় যে পর্যায়টি, এটি হলো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তৃতীয় পর্যায় কীভাবে বুঝতে পারি? তখন ইউরিনে অ্যালবুমিন নেমে যায়। একে বলে মাইক্রোঅ্যালবুমিনিউরিয়া। অনেকে ভাবতে পারেন এটা কী জিনিস? আপনার প্রস্রাবে অল্প পরিমাণ প্রোটিন যেতে পারে। ১৫০ মিলিগ্রাম ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। কিন্তু যতটুকু প্রোটিন যাচ্ছে এর ভেতর যদি অ্যালবুমিনের পরিমাণ বেশি যায়, সেটাকে বলা হয় মাইক্রোঅ্যালবুমিন। অ্যালবুমিনের পরিমাণ বেশি যাচ্ছে, আপনি বুঝতে পারবেন না। সাধারণ পরীক্ষায় ধরা পড়বে না। এর জন্য একটি নির্দিষ্ট পরীক্ষা আছে। এটা আলাদাভাবে করতে হয়।
যাদের ডায়াবেটিস আছে, পাঁচ-ছয় বছর ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছে, তাদের এই অ্যালবুমিন যাচ্ছে কি না সেটা পরীক্ষা করতে হবে। এটা হলো তৃতীয় পর্যায়। এই পর্যায়ে প্রোটিন বের হতে থাকে, রক্তের চাপ বাড়তে থাকে, কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। এই পর্যায়ে ধরতে হবে। এই পর্যায়ে সঠিকভাবে রক্তের সুগারটা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রক্তের চাপ যেটা বেড়ে যাচ্ছে, এটা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। এই পর্যায়কে যদি আপনি ভালো না রাখেন তাহলে আর পাঁচ বছর চলে যাবে। এরপর হয়ে যাবে ওভারপ্রোটিনিওরিয়া। তখন প্রোটিন বেশি করে নির্গত হতে। তখন কী হবে? শরীরে পানি চলে আসবে। কেন পানি আসে? আপনার শরীর থেকে অ্যালবুমিন কমে গেল, তাই পানি আর ধরে রাখতে পারে না। বুকে, পায়ে পানি আসবে। চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে যাবে। এই পর্যায়ে আসতে ২০ বছর সময় লাগে।
এরপর যে পর্যায় সেটি হলো পর্যায় পাঁচ। অর্থাৎ রেনাল ফেইলিউর। ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বাড়বে। ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা তৃতীয় পর্যায়েও বাড়তে পারে। একজন ডায়াবেটিস রোগীর প্রোটিন লিক করতে পারে, নেফ্রাইটিস থাকতে পারে, কিন্তু কিডনির কার্যক্রম ভালো থাকতে পারে। কিডনির কার্যক্রম যদি বুঝতে হয়, তাহলে আপনার ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বের করতে হবে। আর জিএফআর দেখতে হবে। একটি জিনিস হলো ডায়াবেটিস রোগীর জিএফআরটা প্রথমে বেড়ে যায়। ওই পর্যায় থেকে ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। শেষ পর্যন্ত জিএফআরটা কমে যাবে। তখনই রেনাল ফেইলিউর হবে। ক্রিয়েটিনিন আস্তে আস্তে বাড়তে থাকবে। তখন সব রেনাল ফেইলিউরের উপসর্গগুলো আসবে। এগুলো হতে একটি রোগীর ১৫ থেকে ২০ বছর লাগে।
তাহলে দেখেন, যদি আপনি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন তাহলে পর্যায়গুলো বেড়ে যাবে। যদি ডায়াবেটিস ২৫ বছরে ধরা পড়ে আরো ২৫ বছর পর হয়তো আপনি সেই পর্যায়ে যেতে পারেন। তাহলে আপনি যদি ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ রাখেন, তাহলে কিডনির পাশাপাশি সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো ভালো থাকবে।
যত রোগীর রেনাল ফেইলিউর আছে, তাদের বেশির ভাগের হার্টে ব্লক থাকে। করনারি আর্টারিতে সমস্যা হয়ে রাস্তাটা ব্লক হয়ে যায়। শুধু এটি নয়, চোখের সমস্যা হয়, রক্তনালিতে সমস্যা হয়। আপনি দেখেন যার ডায়াবেটিস আছে, তাদের পায়ে ঘা, বোধশক্তি থাকে না। হাঁটতে পারে না, পেশিতে সমস্যা হয়। তাই ডায়াবেটিস যদি নিয়ন্ত্রণে রাখেন, তবে সব কিছু থেকে আপনি পরিত্রাণ পেতে পারেন।
প্রশ্ন : একটা অভিযোগ অনেকে করেন, খাওয়াদাওয়া তো কম করি, তবে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকছে না। সেটা কেন?
উত্তর : একটি বোঝার বিষয়, যাদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের প্রথমে খাবার ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা শুরু করতে হয়। এরপর ইনসুলিন নিলেন, এরপর ওরাল ট্যাবলেট ইনসুলিন নিলেন। আপনি নিয়ন্ত্রণ যদি না করেন, চর্বি বেড়ে যায়, রক্তে লিপিড প্রোফাইল বেড়ে গিয়ে কোলেস্টেরল হার্টে জমা হলো। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য হাঁটাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু আপনি গ্লুকোজ কোষের ভেতর ঢুকাচ্ছেন, কিন্তু আপনি যদি হাঁটেন, তাহলে তো গ্লুকোজ এমনিতেই ঢুকে যায়। তাহলে কী হবে? আপনি চলাফেরা করতে পারবেন। এরা যেটা করে, আমি অসুস্থ হাঁটতে পারছি না। আর ওজন হলে কী হয়, পায়ে ব্যথা হয়, গিরায় ব্যথা করে। এদের দেখা যায় শরীরে চর্বি, পেশি নেই। এরা হাঁটে না, যত হাঁটে, তার চেয়ে বেশি বসে থাকে। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি তো একটি জিনিস নয়, পুরো পদ্ধতিতে সমস্যা হয়। অনেক সময় ডায়রিয়া হয়, কোষ্ঠকাঠিন্য হয়, খাদ্যগুলো শোষণ হয় না। অল্প খেলেও তারা কোষ্টকাঠিন্যের সমস্যায় ভোগেন। সবগুলো জিনিসই একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পর্কিত।
প্রশ্ন : আপনি যেসব পর্যায়গুলোর কথা বললেন, সেগুলো শেষ পর্যায়ে যাওয়ার আগেই আমরা প্রতিরোধের জন্য কী কী করতে পারি?
উত্তর : প্রথম রোগ নির্ণয় করতে হবে যে আমার ডায়াবেটিস আছে কি না। খুব সহজ। প্রস্রাব পরীক্ষা করেও অনেক সময় পাওয়া যায়। রক্তটা পরীক্ষা করতে হবে। খুব বেশি পয়সা লাগে না। কারা ঝুঁকিপূর্ণ? যাদের পরিবারে ডায়াবেটিস রয়েছে, যাদের পরিবারে কিডনির রোগ আছে। যাদের বয়স চল্লিশের ওপরে এবং তাদেরই দেখা উচিত ডায়াবেটিস আছে কি না।
কী করা উচিত। একটি প্রস্রাবের পরীক্ষা করেন, সুগার যাচ্ছে কি না। অথবা রক্তের পরীক্ষা করেন। তাহলে তো জানতে পারলেন। এটা নির্ণয় হলে আপনি নিয়ন্ত্রণ করবেন।
নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রথমে কী? আপনি হাঁটেন, শর্করাজাতীয় খাবার কম খান। একবেলা ভাত খান। কম পরিমাণে খান। সতেজ সবজি খান। রুটি খান, কাঁচা ফলমূল খান। কায়িক পরিশ্রম করেন, একটু হাঁটেন, নিজের কাজটা নিজেই করেন।
এরপরও যদি নিয়ন্ত্রণ না হয়, ট্যাবলেট আকারে অনেক ওষুধ আছে, সেগুলো খান। যদি ট্যাবলেটে কাজ না করে, তখন ইনসুলিন দিতেই হবে। এরপর আপনি যদি চলাফেরা করেন এবং নিজের সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাহলে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। নয়তো রেনাল ফেইলিউর হতে পারে। ডায়ালাইসিস করতে হতে পারে। এ জন্য আমরা বলি নিজের সম্বন্ধে জানেন।
একটি রোগীর ডায়াবেটিস হলে কিন্তু উচ্চ রক্তচাপও হবে। আর ডায়াবেটিস থাকলে কিডনি আক্রান্ত হচ্ছে কি না, সেটি ধরার জন্য পরীক্ষা করতে হবে। একটি হলো ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা দেখতে হবে। ইউরিয়ার মাত্রা দেখা যায়। আর যদি আরো জানতে চান, তাহলে ইজিএফআর করতে পারেন। এটা জানলে আমরা তার কত ভাগ কিডনি কাজ করছে সেটি বুঝতে পারব। প্রথম ডায়াবেটিস নির্ণয়ের পর পাঁচ বা ১০ বছর পর বছরে একবার এই পরীক্ষা করা উচিত।

ফিচার ডেস্ক