শ্বেতি রোগ কেন হয়

শ্বেতি রোগ নিয়ে সমাজে বিভিন্ন রকম নেতিবাচক ভাবনা রয়েছে। তবে শ্বেতি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। নিয়মিত চিকিৎসায় এই রোগ বহুলাংশে ভালো হয়। আজ ১৫ এপ্রিল এনটিভির স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ২০০৬তম পর্বে এ বিষয়ে কথা বলেছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. রাশেদ মোহাম্মদ খান।
প্রশ্ন : শ্বেতি শব্দটি সাদা থেকে এসেছে। কমবেশি সবাই জানেন এই রোগে শরীরের বিশেষ বিশেষ অংশ সাদা হয়ে যায়। এটি হয় কেন?
উত্তর : ত্বক সাদা হয়ে যাওয়ার অনেকগুলো কারণ আছে। এর মধ্যে শ্বেতি একটা। তবে সব সময় সাদা হয়ে যাওয়ার মানে শ্বেতি নয়। আরো অন্যান্য কারণে হতে পারে। যেমন : সাধারণ একটা ফাঙ্গাল ইনফেকশন, যাকে সৈদ বলে অনেকে। এর কারণেও সাদা হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া দেখা যায় যাদের এলার্জি আছে, এর থেকে কখনো কখনো গায়ে ছোপ ছোপ হয়ে যায়। সেটিও শ্বেতি নয়। একেও আমরা সহজে চিকিৎসা করতে পারি।
আর শ্বেতি হলো আমাদের দেহে যে রং তৈরি করে মেলালিন, আমাদের রং যে কালো এটা তৈরি করার জন্য শরীরে মেলানোসাইট নামে একটি কোষ আছে, এই কোষগুলো ধ্বংস হয়ে যায়। শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ওই রং কোষগুলোকে চিনতে পারে না। মনে করে সে বাইরের কেউ। তখন রোগ প্রতিরোধক্ষমতাগুলো একে ধ্বংস করে দেয়। তখন ওই জায়গায় রং তৈরি করতে পারে না কোষগুলো। ধীরে ধীরে সাদা হয়ে যায়।
প্রশ্ন : এই রোগ চিকিৎসা করে প্রতিরোধ করা বা ভালো করে দেওয়া কি সম্ভব?
উত্তর : আমরা আসলে সেই চেষ্টাটাই করি। এটা সম্ভব। যেসব কারণে এটা হয়, শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা যে এটার পেছনে লেগে গেছে। এ ছাড়া আরো কিছু বিষয় আছে এটার। আমরা বলি অক্সিডিসিভ স্ট্রেস। আমাদের শরীরের বিভিন্ন মেটাবোলিজম, এখান থেকে অনেকগুলো ফ্রি রেডিক্যাল তৈরি হয়। এগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিয়ে যদি থামাতে পারি, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় রংটা ফিরে আসে।
প্রশ্ন : শ্বেতী রোগ কি স্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়?
উত্তর : শ্বেতী রোগ ছোঁয়াচে না। সারা দিন যদি কেউ ধরে রাখে, তাহলেও ছড়াবে না। তবে কিছুটা জেনেটিক বিষয় আছে। পরিবারের কারো কারো হতে পারে। কিন্তু এটা কোনোভাবেই ছোঁয়াচে না।
প্রশ্ন : এই রোগ কি সমস্ত শরীরের বেশি হয়, নাকি কোনো কোনো অংশে বেশি হয়?
উত্তর : এর অনেক ভিন্নতা আছে। কারো কারো ক্ষেত্রে হয়তো শুধু একটা জায়গায় হচ্ছে। আবার হয়তো অনেক জায়গায় হচ্ছে। আঙুলে যেটা হয়, একে বলি একরাল ভিডিলিগো। এটা খুব পাজি রকমের। এটার চিকিৎসা করা কঠিন। যেসব জায়গায় লোম নেই, সেসব জায়গায় যখন শ্বেতি বেশি হয় তখন এর রং ফিরিয়ে আনা খুব কঠিন হয়। তবে যেসব জায়গায় লোম আছে সেখানে শ্বেতি হলে আমরা রংটা ফিরিয়ে আনতে পারি।
প্রশ্ন : শ্বেতি হলে এর চিকিৎসার জন্য সাধারণত কী করে থাকেন? এর চিকিৎসা কি দীর্ঘ মেয়াদি করতে হয়?
উত্তর : আমরা যেটা বলছিলাম কী কী কারণে শ্বেতি হয়, যেমন- রোগ প্রতিরোধক্ষমতার জন্য সে সমস্যা হয় তার কিছু ওষুধ আছে। আরেকটি বলছিলাম অক্সিডিসিভ স্ট্রেস। এটি হলে তার চিকিৎসা করতে হবে। আবার কিছু কিছু কেমিকেল আছে। আমরা সেটাকে বলি লিকো ডার্মা, আরেকটাকে বলি ভিটি লিগো। কেমিকেলের কারণে কিছু শ্বেতী রোগ হতে পারে। এসব জায়গায় প্রতিরক্ষার প্রয়োজন আছে। কী কারণে রোগটি হচ্ছে সেটা নির্ণয় করে সারিয়ে দিতে চেষ্টা করি। এভাবেই আমরা শ্বেতী রোগীর চিকিৎসা করি।
প্রশ্ন : এক্ষেত্রে কি পদ্ধতিগত চিকিৎসায় যান না কেবল ক্রিম, অয়েন্টমেন্ট দিয়ে ট্রপিক্যাল এগুলো দিয়ে চিকিৎসা করা হয়?
উত্তর : আমরা প্রথমে পরীক্ষা করে দেখি এটি কি চুপ করে বসে আছে, নাকি বাড়ছে। যদি বাড়ে, তাহলে পদ্ধতিগত চিকিৎসায় চলে যাই। এর মধ্যে একটি চিকিৎসা আছে স্টেরয়েড। এটাকে আমরা কিছুদিনের জন্য দিয়ে থাকি। এটার জন্য ডোজ রয়েছে। আরেকটি বিষয় রয়েছে ফটোথেরাপি। আগে আমরা এক ধরনের ওষুধ গায়ে লাগিয়ে দিতাম, তারপর গায়ে রোদ লাগাতে বলতাম। এই রোদ কালো হওয়ার প্রবণতা বাড়িয়ে দেবে। এরপর আরেকটি পদ্ধতি হলো সূর্যের মধ্যে যে আল্ট্রাভায়োলেট-রে, যেটা কালো করে, এর জন্য একটা মেশিন তৈরি হলো। এখন এসেছে ন্যারো বেনইউভিবি, এটাতে ওষুধ খেতেও হয় না। লাগাতেও হয় না। এর অনেক ভালো ফলাফল রয়েছে। এগুলো হলো পদ্ধতিগত ভালো চিকিৎসা।
ট্রপিক্যালের চিকিৎসা পদ্ধতিতে কিছু ভালো ওষুধ এসেছে। এসবের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনেক কম। এগুলো ব্যবহার করেও অনেকে ভালো হয়। তবে এটা প্রথমেই বলা যাবে না আপনাকে ভালো করে দিতে পারব। অনেকেই ভালো হয়। আবার অনেকের ক্ষেত্রে আবার বিষয়টা ফিরে ফিরে আসতে পারে। তখন চিকিৎসকের কাছে পুনরায় গিয়ে চিকিৎসা করতে হয়। এভাবেই একজন শ্বেতি রোগীকে ভালো রাখি।
প্রশ্ন : এখন ত্বকের চিকিৎসায় লেজার বিষয়টি ব্যাপক প্রচারিত। শ্বেতির বেলায় কি লেজারের কোনো ভূমিকা আছে?
উত্তর : একটি লেজার আছে, যাকে এক্সিমা লেজার বলে। তবে লেজার একটি দামি চিকিৎসা এবং এটা নির্দিষ্ট জায়গায় কাজ করে। তবে আমরা চেষ্টা করি যেই চিকিৎসাগুলো কম খরচে করা যায় সেগুলো দিয়ে রোগীকে ভালো করার।
প্রশ্ন : উপকারিতার দিক থেকে লেজার, ফটোথেরাপি, ইউভি-রে বা ট্রপিক্যাল যেখানে ওয়েন্টমেন্ট দিয়ে আপনারা চিকিৎসা করেন, কিংবা প্রয়োজন হলে সিস্টেমিক। কোন পদ্ধতি বেশি কার্যকরী?
উত্তর : আমরা যখন দেখি পর্যায়ক্রমিকভাবে চিকিৎসাগুলোতে ভালো হচ্ছে না, তখন আমরা দামি চিকিৎসাগুলোর দিকে যাই।
প্রশ্ন : এই রোগটি হওয়ার ব্যাপারে ছেলেমেয়ে বা বয়স এ রকম পার্থক্য আছে কী?
উত্তর : এই রোগ আমরা সবার মধ্যেই পাই। তবে মেয়ে রোগী অনেক বেশি আসে। কেননা মেয়েটিকে বিয়ে দিতে হবে। সামাজিকভাবে হেয় হবে। অনেকে মনে করেন এটি ছোঁয়াচে। তবে এই রোগ হলে কিছু প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এখানে সূর্যের আলোর কারণে ত্বকে যে ক্ষতি হয়, সেটি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই ছাতা ব্যবহার করতে হবে। সানস্ক্রিন লোশন ব্যবহার করতে হবে। তবে আমরা একটা বিষয় বলি, সকাল ৯টা থেকে ১০টার যে রোদটা এটি তাদের জন্য ভালো। এরপর সূর্যের থেকে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।