বিশ্ব অ্যাজমা দিবস
অ্যাজমার চিকিৎসা

আজ বিশ্ব অ্যাজমা দিবস। এ দিনটি সামনে রেখে বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে নানা আয়োজন। তেমনি বাংলাদেশেও এ দিনকে ঘিরে পালিত হচ্ছে বিভিন্ন রকমের আয়োজন। তাই আজ আমাদের বিশেষ আয়োজন অ্যাজমা। আজ ৫ মে এনটিভির স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ২০২৬তম পর্বে এ বিষয়ে কথা বলেছেন বারডেম হাসপাতালের মেডিসিন এবং বক্ষব্যাধি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম দেলোয়ার হোসেন।
প্রশ্ন : অ্যাজমা অত্যন্ত জটিল একটি রোগ এবং ক্রনিক রোগ। বলে থাকি, একবার হলে আর ভালো হয় না। নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। পৃথিবীব্যাপী এই দিনটিকে এত গুরুত্ব দেওয়ার কারণ কী? এ বছর এই দিবসের মূল প্রতিপাদ্য কী?
উত্তর : সারা বিশ্বে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন লোক অ্যাজমা রোগে ভুগছে। আর আমাদের দেশে এই রোগীর সংখ্যাও কম নয়। ১৯৯৯ সালের একটি পরিসংখ্যানে দেখা গিয়েছিল, আমাদের দেশে ৭০ লাখ লোক অ্যাজমা রোগে ভুগছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশে শতকরা ৮০ ভাগ লোকই বৈজ্ঞানিক উপায়ে যে চিকিৎসা আছে, সেটি নেয়নি বা নিতে পারছে না। অ্যাজমার কারণে যত লোক মারা যায়, তার ৮০ ভাগ আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার মাধ্যমে। শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা বিশ্বেই এ সমস্যা আছে। এটা সামনে রেখে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুনিয়াব্যাপী গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর অ্যাজমা ১৯৯৮ সালে প্রথম একটি উদ্যোগ নেয়। প্রথমে ৩৮টি দেশে এটি পালন করা হয়, এখন সারা দুনিয়ায় এটি পালিত হচ্ছে। অ্যাজমা রোগীদের সচেতন করা হয় যেন রোগটি তাঁরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন এবং প্রতিরোধ করতে পারেন। এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, আপনি আপনার অ্যাজমাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।urgentPhoto
অ্যাজমাকে আমি আসলে খুব জটিল রোগ মনে করি না। এটি একটি শ্বাসনালির সমস্যা। শ্বাসনালির দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগ। আমাদের যে শ্বাসনালি আছে, নাক থেকে যে রাস্তাটিতে বাতাস ঢোকে সেটি আসলে ফুলে যায়। ফুলে গেলে দুটি জিনিস হয়। এটি সরু হয়ে যায় এবং ফুলে থাকার জন্য এটি সংবেদনশীল হয়ে যায়। যার ফলে একটু আবহাওয়ার পরিবর্তন, ধুলাবালি, ঠান্ডা-গরম এ সমস্যা হয়। যদি শ্বাসনালি সংবেদনশীল থাকে, তবে এটি আরো সরু হয়ে যায়। এর ফলে উপসর্গ হিসেবে কাশি, শ্বাসকষ্ট, বুকে চাপ লাগা, বুকে শোঁ শোঁ বাঁশির মতো আওয়াজ হয়।
প্রশ্ন : যেসব রোগের লক্ষণ বললেন, এগুলো তো সিওপিডি বা অন্যান্য রোগের ফলেও হতে পারে। আপনারা কী করে এটিকে আলাদা করেন যে অ্যাজমা?
উত্তর : বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল নির্ণয়ের মাধ্যমে আমরা এটা পরীক্ষা করি। রোগীর ইতিহাস, উপসর্গ এসবের ওপরে ভিত্তি করে নির্ণয় করি। অ্যাজমা সাধারণত যেকোনো বয়সে হয়ে থাকে। সিওপিডিতেও শ্বাসকষ্ট হয়। সাধারণত ৪০ বছর পরে হয়। সিওপিডি যাঁদের হয়, তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি ধূমপানের ইতিহাস থাকে। অ্যাজমা আসলে পারিবারিকভাবে থাকে। অ্যাজমা সাধারণত ধুলাবালি, ফুলের রেণু এসবের সংস্পর্শে এলে তীব্র হয়ে যেতে পারে। এটা হলে কিছুদিন ভালো থাকে। আবার কিছুদিন পরে হয়, এভাবে চলতে থাকে। তবে সিওপিডি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকবে।
প্রশ্ন : একজন মানুষ এ সমস্যা নিয়ে এলে তাঁর প্রতিকারের জন্য কী করতে হবে?
উত্তর : রোগনির্ণয় হয়ে যাওয়ার পর কতগুলো বিষয় আমরা করি। প্রথমত, রোগটি সম্বন্ধে বলি। বলি যে এর ওষুধ দীর্ঘমেয়াদি নিতে হবে। কারণ, এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত রোগ। এ ক্ষেত্রে আমরা তিন ধরনের ওষুধ ব্যবহার করি। কিছু ওষুধ আছে যেগুলো শ্বাসনালিকে সরু করে দেয়। এতে এর কষ্ট কমে যায়। কিছু ওষুধ আছে, যা ফোলাটা কমিয়ে দেবে। আমাদের মূল ওষুধটা থাকে ফোলাটা কমিয়ে আনার জন্য। তৃতীয়ত, ট্রিগার ফ্যাক্টর (যেগুলো রোগ উত্তেজিত করে দেয়) সেগুলো নির্ণয় করতে হবে এবং পরিহার করতে হবে। এখানে দুটি বিষয় হচ্ছে, যেটা হলো প্রতিরোধক মেডিসিন, যেটা স্টোরয়েড ইনহেলার, এটা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ইনহেলার বন্ধ করা যাবে না। কারণ, ফোলা কমার ওষুধ যদি সে বন্ধ করে দেয়, সমস্যাটি আবার বেড়ে যাবে। তবে কেউ যদি দীর্ঘমেয়াদি এই ফোলা কমানোর ওষুধ ব্যবহার করেন, এতে ফোলা কমে গেলে শ্বাসনালির সংবেদনশীলতা কমে যাবে। এতে তাঁর কষ্ট কমে যাবে।
প্রশ্ন : এই ওষুধের বেলায় একটি কথা শোনা যায়, এই রোগে ইনহেলার ব্যবহার করলে এটা সারা জীবন ধরে চলতে থাকে। বন্ধ করা যায় না। এই ধারণা কতটা সত্য? এটা বন্ধ করতে চাইলে কখন বন্ধ করতে হয়?
উত্তর : এটা একদম ভুল ধারণা যে একবার শুরু করলে সারা জীবন ধরে চালাতে হবে। যেটা দেখতে হবে যে ওষুধগুলো দিয়ে রোগের উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণে আছে কি না। যদি একজন রোগী তিন মাসের ওষুধ নিয়ে ভালো থাকেন—তাঁর কোনো কষ্ট নেই, কাশি নেই, বুকে চাপ নেই—তখন আমরা ওই ওষুধগুলোর শতকরা ২৫ ভাগ কমিয়ে দিই। আবার তিন মাস পর যখন আসে, ২৫ থেকে ৫০ ভাগ কমিয়ে দিই। এভাবে ধীরে ধীরে কমিয়ে দিই। আবার যখন দেখি সমস্যা বাড়ছে, তখন ওষুধ বাড়িয়ে দিই। এভাবে ধীরে ধীরে ওষুধ কমিয়ে দিই। একসময় যদি দেখি সে ভালো আছে, তখন ওষুধ একেবারেই কমিয়ে দিই।
চিকিৎসকই নির্ধারণ করবেন, এটা কখন কমাতে হবে এবং কখন বাড়াতে হবে। তবে যে ধারণা প্রচলিত আছে, একবার ওষুধ দিলে সেটি বন্ধ করা যাবে না, সেটি ঠিক নয়। এটি বন্ধ করা যায়।
প্রশ্ন : খাবারের সঙ্গে অ্যাজমার সম্পর্ক কী? এবং কতটুকু?
উত্তর : কেবল খাবার-দাবারেই নয়, কেউ বলে ফ্রিজের ঠান্ডা পানি খেলে হয়। কেউ বলে যে সর্দি লাগলে হয়। কেউ বলে যে পারফিউমের গন্ধ লাগলে হয়। আবেগীয় বিষয় হাসি-কান্নায়ও অ্যাজমা বেড়ে যায়। সব রোগীর একই বিষয় হলো উত্তেজনা। কারো খাবার থেকে হয়, কারো পরিবেশগত কারণে হয়, ধুলাবালি থেকে হয়, সিগারেটের গন্ধ থেকে হয়। যেটি করলে বাড়ে, সেটি প্রথম নির্ণয় করতে হবে এবং এটি পরিহার করতে হবে।