মেরুদণ্ডের ব্যথায় করণীয়

মেরুদণ্ডের ব্যথায় অনেক মানুষকেই ভুগতে দেখা যায়। সাধারণত অঙ্গবিন্যাসের কিছু ভুল অভ্যাসের ফলে এই ব্যথা হয়ে থাকে।আজ ১৩ মে এনটিভির স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ২০৩৪ তম পর্বে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে কর্মরত অধ্যাপক ডা. জোনাইদ শফিক।
প্রশ্ন : মেরুদণ্ড আমাদের দেহের বড় একটি বিষয়। আমরা যে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি, বাঁকা হই সেটার সব মেরুদণ্ডের কারণে। তাই আমরা বলি মেরুদণ্ড খুব গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের এ রকম প্রয়োজনীয় অংশে যখন ব্যথা হয় এটা অত্যন্ত ভয়াবহ। এই ব্যথা হয় কেন?
উত্তর : শরীরের যে ভারসাম্য রাখা হয় তা নিয়ন্ত্রণ করে মেরুদণ্ড। মেরুদণ্ডের উপরে আমাদের সব চাপ পড়ে। ঘুমের জন্য ঘাড়ের প্রয়োজন হয়, দাঁড়ানোর সময় কোমরের প্রয়োজন হয়, তেমনি দেহের ভারসাম্য বজায় রাখতে মেরুদণ্ডের প্রয়োজন হয়। মেরুদণ্ডটি যেভাবে থাকার কথা এই পদ্ধতির বাইরে যদি আপনি কাজ করেন তখনই আপনার অসুবিধা হবে। বলা হয়, পৃথিবীতে ব্যথায় ভোগে না এমন কোনো লোক নেই। এর মধ্যে ৯৯ ভাগ ব্যথা হচ্ছে মাথা ব্যথা, একবার না একবার হবেই। দ্বিতীয় ব্যথাটিই হচ্ছে, মেরুদণ্ডের ব্যথা। হয়তো এটা ঘাড়ে ব্যথা হবে, কোমর ব্যথা হবে , নয়তো পিঠ ব্যথা হবে। বলা হয়, ৪০ থেকে ৫০ ভাগ মানুষ পৃথিবীতে এই ব্যথায় ভুগবেই। এর মধ্যে ১ ভাগ ক্রনিক ব্যথায় চলে যায়। অর্থাৎ নিয়মিত ভুগতে পারে। এর প্রধান বিষয়টি আমরা বলি যান্ত্রিক (ম্যাকানিক্যাল) কারণ। আপনি হয়তো ছোট খাটো কোনো অনিয়ম করলেন তার কারণে এই ব্যথা হতে পারে। ধরেন, আপনি বাসায় একটি স্যুটকেস টান দিতে গেলেন একটু কুঁজো হয়ে, ভারী একটি জিনিস তুলতে গেলেন, এই তুলতে গেলেই হয় কি, আমাদের মেরুদণ্ডের মধ্যে একটি শক্ত হাঁড় থাকে, একটি নরম হাঁড় থাকে, একটা মাংস পেশি থাকে। এই মাংস পেশির চাপের কারণে ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ব্যথাটি হয়। মূলত এটাকে যান্ত্রিক ব্যথা বলি। তবে এই ব্যথা চলে যায়। কোনো ওষুধেরও প্রয়োজন হয় না। বেশি হলে হয়তো একটি পেশির রিলাক্সেন ওষুধ লাগতে পারে।urgentPhoto
মানুষ এই ব্যথায় বেশি আক্রান্ত হয়। আর এটা ভালোও হয়ে যায়। বাকি ২০ শতাংশ হলো অন্য কোনো কারণে হয়। এর মধ্যে যে কারণটা রয়েছে, আমাদের যেই নরম হাঁড়টি রয়েছে এটা একটা ডিক্সের মতো, এটি স্প্রিংয়ের মতো কাজ করে। এটি যখন দুর্বল হয়ে যায়, তখনই সমস্যা তৈরি হয়ে যায়। আর এর উপর যে মেরুদণ্ড আছে, সেটা যখন ক্ষয় হওয়া শুরু হয় তখন অস্টিও আরথ্রাইটিস হয়ে যায়। মূলত যখন হাঁড়টি ক্ষয় হয়ে যাবে তখন ডিস্কের ওপর সে চাপ দিবে, চাপ দিলে আমাদের দুই পাশ থেকে অনেক স্নায়ু যায়, যেটা পা-কে নিয়ন্ত্রণ করে, ঘাড়ে হলে হাতকে নিয়ন্ত্রণ করে, সেগুলো যখন কমপ্রেশন হবে, তখন সমস্যা হয়। যদি বাম দিকের ঘাড়ে চাপ হয়, তখন বাম হাতে সমস্যা হবে। ডান দিকের ঘাড়ে হলে ডান হাতে ব্যথা হবে।
প্রশ্ন : আপনি শুরুতে বলছিলেন মেরুদণ্ডটি যেরকম থাকার কথা সে রকম না হলে সমস্যা তৈরি হয়। এ রকম না থাকার কারণ কী?
উত্তর : আমরা যারা অফিসে কাজ করি, অনেক্ষণ বসে কম্পিউটারে কাজ করি। চেয়ারে যদি অনেক্ষণ বসে থাকি তাহলে যেই অবস্থায় এটা থাকার কথা সেই অবস্থায় আর থাকে না। তখন নরম হাড়ের ওপর চাপ পড়ে। ধীরে ধীরে এটা দুর্বল হয়ে যাবে। শোয়ার সময়ও এটা ঠিক করতে হবে। আমার বিছানাটা যদি শক্ত হয়, অথবা বেশি নরম হয় তখন এই অবস্থাটি ঠিক রাখা যাবে না। তখন এই অসুবিধাগুলো হবে। পাশাপাশি প্রত্যেকের মেরুদণ্ডের একটি ভার বহনের ক্ষমতা আছে সেটার বাইরে যদি আমি কাজ করি, ধরেন আমরা ভারি কাজের অভ্যাস নেই তখন যদি আমি ভারি কিছু তুলতে যাই, তখন এই ডিস্কগুলোতে সমস্যা তৈরি হবে। এইগুলো হলো সবচেয়ে প্রচলিত কারণ। যেই কাজে আমি অভ্যস্ত না, সেই কাজ যখন করতে যাব তখন মেরুদণ্ডে চাপ পড়বে। এর ফলে প্রথমে হয়তো ম্যাকানিক্যাল ব্যথা হবে । আবার ব্যথা চলে যাবে। তবে ভয়ের জিনিস হলো যখন ডিস্ক ব্যথা হয়ে যায়।
আমি সবসময় বলি আপনি যেইভাবে কাজ করেন এটি মেনে চলতে চেষ্টা করবেন এবং আপনার অঙ্গবিন্যাসটি কী রকম হওয়া উচিত সেটা যদি আপনি জানেন এবং মেরুদণ্ডটিকে যদি সঠিকনিয়মে মেনে চলতে পারেন তবে সহজে ব্যথা হবে না।
প্রশ্ন : আমরা জানি, মেরুদণ্ডের ব্যথা আরো অনেক কারণে হয়ে থাকে। তাই ব্যথাটি কোন ধরনের এটা বোঝার উপায় কী?
উত্তর : আপনার যখন ব্যথা হবে কিছু রোগ নির্ণয়ের নিয়ম আছে। চিকিৎসকের কাছে যখন যাবেন, তখন যদি বলেন, আপনার কোমরে ব্যথা হচ্ছে, পা ঝির ঝির করে, শির শির করছে, কোনো আঙ্গুল অবশ মনে হচ্ছে, অথবা রগে টান দিচ্ছে, কিছুদূর হাঁটার পর হাঁটতে পারছি না, গেলেই পাঁচ মিনিট পড়ে বসে যেতে হচ্ছে, একটু বিশ্রাম নিলে হয়তো হাঁটতে পারি তখন বুঝতে হবে ডিস্ক এ কোনো সমস্যা হচ্ছে। এর রোগ নির্ণয়ের সহজ পদ্ধতি হলো এক্সরে করা এবং এমআরআই করা। এমআরআই করলে মাঝখানের এই নরম হাড়টা বেশি দেখা যাবে। আর যদি ১০০ ভাগ নির্ণয় করতে চান তবে একটি এমআরআই করতেই হবে। এমআরআই করলে পাশে যে রগগুলো আছে সব ভেসে উঠবে, কোথায় রগ চাপ খেয়ে গেছে সেই জিনিসটিও বের হয়ে যাবে।
প্রশ্ন : এ রকম হলে করণীয় কী?
উত্তর : সারা পৃথিবীতে এই চিকিৎসাকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমে ওষুধ খাবেন, কাজ না হলে ইন্টারভনেশনে যাবেন, এটাতে কাজ না হলে সার্জারিতে যাবেন।
প্রশ্ন : এসবের সঙ্গে জীবনযাত্রার ধরনের সম্পর্ক আছে কী?
উত্তর : আমি বলি, ওষুধ হচ্ছে ২০ শতাংশ রোগ নিরাময় করে। আর ৮০ শতাংশ রোগ নিরাময় করে জীবন যাত্রার পরিবর্তন। কিছু অঙ্গবিন্যাস সঠিক নিয়মে করতে হবে। এসব বিষয় নারীদের ক্ষেত্রে বেশি হয়, যারা রান্না ঘরে কাজ করে। তাদের এসব বিষয় খেয়াল রাখতে হবে।
খাওয়ার দিকে খেয়াল রাখতে হবে। আমার অভিজ্ঞতায় দেখিছি, ৪০ বছরের কাছাকাছি গেলে নারীদের এই সমস্যা হয়ে যায়। এ ছাড়া চিকিৎসকের কাছে এলে আমরা ইনজেকশন দিয়ে ব্যথা কমানোর চেষ্টা করি, এতে ফোলাটাও কমে যায়। তাতে আপনার ব্যথার ওষুধও খেতে হবে না। এর ওপর নির্ভরও করতে হবে না এবং সেটাতেও ভালো না হলে পরবর্তী সময়ে সার্জারি করা যেতে পারে। তবে সবসময় এটা করা লাগে না । যদি কোনো কারণে প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায়, বা প্যারালাইসিস হয়ে যায় তখন সার্জারি করতে হয়।