ডিমকে কেন ‘মস্তিষ্কের খাবার’ বলা হয়? কুসুমসহ খাবেন নাকি ছাড়া
আজ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে ৩০তম বিশ্ব ডিম দিবস। এ বছর দিবসটির আন্তর্জাতিক মূল প্রতিপাদ্য বা থিম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘প্রোটিন যা শক্তি দেয় ও সুরক্ষা করে’। এক সময় মনে করা হতো ডিমের কুসুম হার্টের জন্য ক্ষতিকর, কিন্তু সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গবেষণায় সেই ভুল ধারণায় অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক বিজ্ঞান ডিমকে কেবল একটি সস্তা প্রোটিন হিসেবে নয়, বরং মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা ধরে রাখার এবং দীর্ঘায়ু লাভের অনন্য মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে।
ডিম নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা থেকে পাওয়া এমন কিছু নতুন তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো-
১. অ্যালঝাইমার্স বা স্মৃতিভ্রংশের ঝুঁকি কমায় ২৭ শতাংশ
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লোমা লিন্ডা ইউনিভার্সিটি হেলথের গবেষকদের একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার ফল সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স ডেইলিতে প্রকাশিত হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ৪০ হাজার বয়স্ক মানুষের ওপর ১৫ বছর ধরে চালানো এই গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে অন্তত ৫টি বা তার বেশি ডিম খান, তাদের ক্ষেত্রে মরণব্যাধি অ্যালঝাইমার্স (স্মৃতিভ্রংশ রোগ) হওয়ার ঝুঁকি ২৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।
বিজ্ঞানীদের মতে, ডিমের কুসুমে থাকা ‘কোলিন’ নামক বিশেষ উপাদান মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ বাড়াতে এবং স্মৃতিশক্তি তীক্ষ্ণ রাখতে সরাসরি ভূমিকা রাখে। এই গবেষণা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য আপনারা সরাসরি প্রতিবেদন থেকে পড়ে নিতে পারেন।
২. বুদ্ধি ও স্মৃতির পাহারাদার
চিকিৎসা ও বিজ্ঞান গবেষণা সংক্রান্ত বিশ্বখ্যাত ডাটাবেজ সায়েন্স ডাইরেক্টে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রতিদিন অন্তত অর্ধেক বা ১টি গোটা ডিম খাওয়া সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের মনোযোগ, কথা বলার সাবলীলতা এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাড়ায়। গবেষণার তথ্য অনুসারে, ডিমের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানগুলো বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়া রোধ করে।
৩. চোখ ও হাড়ের প্রাকৃতিক সুরক্ষাকবচ
আন্তর্জাতিক পুষ্টি সংস্থা ওয়ার্ল্ড এগ অর্গানাইজেশনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ডিমের কুসুমে রয়েছে দুটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট—লুটেইন এবং জিক্সানথিন। এগুলো চোখের রেটিনাকে ক্ষতিকর ‘ব্লু লাইট’ (মোবাইল ও কম্পিউটারের স্ক্রিনের আলো) থেকে রক্ষা করে। বয়সের কারণে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার ঝুঁকি কমায়। এছাড়া, প্রাকৃতিকভাবে যে কয়েকটি খাবারে ভিটামিন-ডি পাওয়া যায়, তার মধ্যে ডিম অন্যতম, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং হাড় মজবুত করতে অপরিহার্য।
৪. পরিবেশবান্ধব প্রোটিনের সেরা উৎস
বিশ্বের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়ক বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, গরু বা খাসির মাংস উৎপাদনের তুলনায় ডিম উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ বা পরিবেশের ক্ষতি অনেক কম হয়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করে বিশ্বব্যাপী পুষ্টির ঘাটতি মেটাতে ডিমকে সবচেয়ে টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব প্রোটিন হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, আমাদের দেশে জনপ্রতি বার্ষিক ডিমের প্রাপ্যতা বর্তমানে ১৩৭টি, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ২০০-তে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে।
৫. বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও সতর্কতা
আন্তর্জাতিক পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, যাদের হৃদরোগ বা উচ্চ কোলেস্টেরলের মতো জটিলতা নেই, এমন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দিনে একটি গোটা ডিম খাওয়া নিরাপদ। মস্তিষ্কের পুষ্টি কোলিন ও চোখের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট মূলত কুসুমেই থাকে।
তবে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন ও হার্ভার্ড হেলথের সতর্কবার্তা অনুযায়ী— যাদের ডায়াবেটিস, বংশগত উচ্চ কোলেস্টেরল বা হৃদরোগের ঝুঁকি রয়েছে, তাদের কুসুম খাওয়ার ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ বজায় রাখতে হবে। তাদের ক্ষেত্রে সপ্তাহে ৩ থেকে ৪ টির বেশি কুসুম না খাওয়ার বা কেবল ডিমের সাদা অংশ খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। এছাড়া চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করাই শ্রেয়।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক