বাঙালির ডিম-কাব্য!
জগতে কত রকমের দিবসই না আছে— প্রেম দিবস, বন্ধু দিবস, এমনকি ‘ডিম রোল দিবস’ নিয়েও মাতামাতি কম হয় না! তবে আজ শুক্রবার (৯ অক্টোবর) খোদ ‘বিশ্ব ডিম দিবস’। প্রতি বছর অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার বিশ্বজুড়ে এই গোলকার বস্তুটি স্মরণে দিবসটি ধুমধাম করে পালিত হয়। পুষ্টি জোগাতে তো বটেই, এ দেশে ক্ষোভ প্রকাশ থেকে শুরু করে জন্মদিনের উদযাপন- সবখানেই ডিম এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
বলার অপেক্ষা রাখে না, মধ্যবিত্ত বাঙালির জীবনে ডিমের অবদান হিমালয় পর্বতের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। মাসের শেষে পকেটে যখন টান পড়ে, তখন ওই একটাই ভরসা— ‘ডিম’। সকালে ওমলেট, দুপুরে ডিমের ডালনা আর রাতে ডিম ভাজি। ব্যচেলর লাইফের এই চিরন্তন মেন্যু ছাড়া বাঙালি জীবন ভাবাই যায় না।
ডিমের ‘ডিগবাজি’
ডিম যেমন আমাদের পুষ্টি দেয়, তেমনি আমাদের বিনোদন ও ক্ষোভ প্রকাশেরও বড় খোরাক। এ দেশে ডিমের দাম প্রায়ই ‘ডিগবাজি’ খেয়ে ওপরে ওঠে যায়। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বয়ে যায় ট্রোলের বন্যা। আবার রাজনৈতিক অঙ্গনেও ডিমের এক ঐতিহাসিক ক্ষমতা রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির ওপর জনতা ক্ষুব্ধ হলে, মঞ্চে বা গাড়িবহরে প্রথম যে জিনিসটি ধেয়ে যায়, তা হলো পচা ডিম! পৃথিবীর বহু দেশেই ডিমকে প্রতিবাদের এক অহিংস কিন্তু চরম অপমানজনক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
প্রতিবাদ বাদ দিন, বাঙালির আনন্দের উৎসবেও ডিমের উপস্থিতি রয়েছে। কারো জন্মদিন মানেই তাকে জাপটে ধরে মাথায় ডিম ভাঙার অদ্ভুত সংস্কৃতি চালু হয়েছে এ দেশে! ময়দা আর ডিমের এই তরল মিশ্রণ মাথায় মেখে যখন বার্থডে বয় বা গার্ল দাঁড়িয়ে থাকে, তখন মনে হয় যেন জীবন্ত এক কেক! ভাবুন তো, কত চড়া দামের জিনিস মানুষ স্রেফ ক্ষোভ ঝাড়তে কিংবা আনন্দ করতে নষ্ট করছে!
সবচেয়ে বড় বিতর্ক : হাঁস না মুরগি?
ডিম নিয়ে বাঙালির চিরন্তন এক গৃহযুদ্ধ আছে—‘হাঁসের ডিম নাকি মুরগির ডিম?’ একদল বলবে হাঁসের ডিমের কুসুমের যে রাজকীয় লাল ভাব, তা মুরগির ডিমে কই? অন্য দল আবার মুরগির ডিমের বনেদি রূপের গুণগানে পঞ্চমুখ। তবে আসল কথা হলো, ডিম যারই হোক, কড়াইয়ে গিয়ে যখন পেঁয়াজ-মরিচে মাখামাখি হয়ে ওমলেট হয়, তখন সব যুদ্ধ থেমে যায়।
সেদ্ধ, ভাজা নাকি হাফ বয়েল?
ডিম রান্নার ধরনেও বাঙালির একেক জনের একেক মত। কেউ সকালে কড়া করে ভাজা ডিম ছাড়া নাস্তা ভাবতেই পারেন না। আবার ডায়েট সচেতনদের ভরসা কেবলই পুরো সেদ্ধ ডিম। তবে আসল ট্র্যাজেডি ঘটে ‘হাফ বয়েল’ বা ‘পোচ’ নিয়ে। পাউরুটির ওপর আলতো করে ডিমের পোচ রেখে কামড় দেওয়ার পর কুসুম গলে পড়ার যে স্বর্গীয় সুখ, তা কোনো ফাইভ স্টার হোটেলের খাবারও দিতে পারবে না! তবে হ্যাঁ, এই হাফ বয়েল কুসুম মুখে তুলতে গিয়ে মাখামাখি করার রেকর্ডও বাঙালির কম নেই।
কুসুম খাব নাকি ফেলে দেব?
বাঙালির ফিটনেস ও ওজনের ডায়েরিতে ডিমের কুসুম এক মস্ত বড় ধাঁধা। একদল মনে করে কুসুম খেলেই বুঝি মেদ জমে ভুঁড়ি এক হাত বেড়ে যাবে, তাই তারা কুসুম ফেলে শুধু সাদা অংশ চিবিয়ে খায়। অন্যদিকে খাঁটি ভোজনরসিক বাঙালির দাবি— ‘কুসুম ছাড়া ডিম খাওয়া আর প্রেমিকা ছাড়া ডেটে যাওয়া একই কথা!’ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান অবশ্য মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে বলে ; হার্টের বা উচ্চ কোলেস্টেরলের বড় কোনো অসুখ না থাকলে সুস্থ মানুষের পক্ষে দিনে একটা পুরো ডিম কুসুমসহ খাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
বাঙালির অন্তহীন ডিম-জিজ্ঞাসা
ডিম নিয়ে বাঙালির প্রশ্নেরও কোনো শেষ নেই! বাজারে গেলে তারা খোঁজে ‘ডিমটা কি ফার্মের নাকি দেশি?’, ‘বাদামি ডিমের পুষ্টি কি সাদা ডিমের চেয়ে বেশি?’ (যদিও বিজ্ঞান বলে দুটোর পুষ্টি একই)। এমনকি ডিম সেদ্ধ করার পর খোসা না ছাড়লে গৃহিণীদের মেজাজ বিগড়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘরে ঘরে ঘটে। আর সবচেয়ে বড় প্রশ্নের উত্তর তো বাঙালি আজও হাতড়ে বেড়াচ্ছে— আগে মুরগি নাকি আগে ডিম?
কেন খাবেন ডিম?
ডিম নিয়ে পুষ্টিবিজ্ঞানীদের প্রশংসার শেষ নেই। এটিকে বলা হয় ‘সুপার ফুড’। এতে আছে উচ্চমাত্রার প্রোটিন ও মস্তিষ্কের জন্য উপকারী কোলিন, যা আপনার শরীরে শক্তি জোগাবে এবং সুরক্ষাকবচ তৈরি করবে। আপনি যদি অলসও হন, মাত্র ১০ মিনিটেই সেদ্ধ ডিম বানিয়ে সাবাড় করে দিতে পারেন। এর চেয়ে সহজ পুষ্টি আর কোথায় পাবেন?
কাজেই আজ আর ডায়েটের চিন্তা নয়। বিশ্ব ডিম দিবসে নিজেকে অন্তত একটা ডিম উপহার দিন। কারণ, ডিম আছে তো জীবন আছে!

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক