তিনি পড়েননি, আজ তাঁকে নিয়ে চলে পড়াশোনা
মাত্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন তিনি। সেই সময়টুকুও ঠিকমতো ক্লাসে গেছেন কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। অথচ তাঁর লেখা কবিতা নিয়ে গবেষণা করে রীতিমতো পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন পাঁচজন।
ভারতের পশ্চিম উড়িষ্যার এই লেখকের নাম হলধর নাগ (৬৬)। গত সোমবার তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে পদ্মশ্রী পুরস্কার। মূলত প্রাচীর কোসলি ভাষায় কবিতা লেখেন তিনি। মজার ব্যাপার হলো নিজের লেখা ২০টি মহাকাব্য এবং সব কবিতা হলধরের মুখস্ত।
সাম্বালপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে পড়ানো হয় ‘হলধর গ্রন্থাবলী’।
লেখক সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাঁর এক ঘনিষ্ঠজন বলেন, ‘তিনি যা লেখেন তা তিনি মনে রাখতে পারেন এবং আবৃত্তি করতে পারেন। আপনাকে শুধু কবিতা বা লেখার নামটি বলতে হবে। তিনি কখনো কিছুই ভুল বলেন না। এখন এমন অবস্থা যে প্রতিদিন তিন থেকে চারটি অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করতে আমন্ত্রণ জানানো হয় তাঁকে।’
টাইমস অব ইন্ডিয়াকে হলধর নাগ বলেন, ‘কোসলি ভাষায় লেখা কবিতা সম্পর্কে তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ দেখে আমার ভীষণ ভালো লাগে। আসলে প্রত্যেকেই একজন কবি। তবে এদের মধ্যে কিছু মানুষ আছেন যারা এগুলোকে নির্দিষ্ট আকার দিতে পারেন।’
পদ্মশ্রী পুরস্কার পাওয়া এই মানুষটি কখনো পায়ে জুতো পরেননি। সবসময়ই একটি সাদা ধুতি ও ফতুয়া পরে থাকেন। এই ধরনের পোশাকের কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই পোশাকে আমি স্বাধীন বোধ করি।’
১৯৫০ সালে উড়িষ্যার বারঘর জেলার এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেন হলধর নাগ। মাত্র তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন তিনি। ১০ বছর বয়সে বাবার মৃত্যুর পরই স্কুল ছেড়ে দিতে হয় তাঁকে। নিজের ছোটবেলা সম্পর্কে হলধর বলেন, ‘একজন বিধবার সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা ভীষণ কষ্টের।’ কীভাবে না চাইতেও স্থানীয় একটি মিষ্টির দোকানে থালা-বাটি ধোয়ার কাজ করতে হয়েছে সে সম্পর্কে জানান তিনি।
এর দুই বছর পর এক গ্রামপ্রধান তাঁকে হাইস্কুলে নিয়ে যান। তবে সেটা পড়তে নয়, বাবুর্চি হিসেবে কাজ করতে। সেখানেই ১৬ বছর কাজ করেন তিনি। এক সময় এলাকায় আরো অনেক স্কুল তৈরি হলো। পরে তিনি এক ব্যাংক কর্মকর্তার কাছ থেকে এক হাজার টাকা ধার করে ছোট একটি দোকান দেন। সেখানে স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের স্টেশনারি সামগ্রী ও খাবার জিনিস বিক্রি করতেন হলধর। মূলত সেই সময়ই লেখালেখি শুরু করেন হলধর।
১৯৯০ সালে হলধর প্রথম লেখেন ‘ধোদো বাড়গাছ’ বা পুরোনো বটগাছ কবিতাটি। যা স্থানীয় একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি ওই পত্রিকায় মোট চারটি কবিতা পাঠান, যার সবই ছাপা হয়। এ থেকেই অনুপ্রেরণা পান বলে জানান হলধর। এরপর আশপাশের এলাকায় ঘুরে ঘুরে কবিতা আবৃত্তি করতে শুরু করেন তিনি। আর এতে বিপুল সাড়াও পান।
মূলত, প্রকৃতি, সমাজ, পুরাণ এবং ধর্ম নিয়ে কবিতা লেখেন হলধর। নিজের লেখনিতে সমাজের বাস্তব অবস্থার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে চান বলে জানান তিনি। আর কবিতার মাধ্যমেই সাধারণ মানুষের কাছে বিভিন্ন বার্তা পৌঁছে দিতে চান হলধর নাগ।

অনলাইন ডেস্ক