ইউক্রেনের কতটুকু ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণে রয়েছে রাশিয়ার?
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার (১৫ আগস্ট) আলাস্কায় ইউক্রেনে চলমান তিন বছরের যুদ্ধের অবসানের বিষয়ে আলোচনা করতে বৈঠকে বসবেন। এই আলোচনায় ‘ভূমি বিনিময়’ নিয়ে কথা হতে পারে, যার অর্থ রাশিয়া ইউক্রেনের দখলকৃত কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারে। খবর আলজাজিরার।
হোয়াইট হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া ইউক্রেনের একটি বড় অংশ দখল করেছে। তারা প্রধান ভূখণ্ড দখল করেছে। আমরা সেই ভূখণ্ডের কিছু অংশ ইউক্রেনের জন্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব।’
তবে এই বিনিময়ের ধারণাটি ইঙ্গিত দেয় যে, ইউক্রেনকে বর্তমানে তার নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হতে পারে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বারবার বলেছেন, রাশিয়ার কাছে ইউক্রেনের ভূমি হস্তান্তরের যেকোনো চুক্তি ব্যর্থ হবে। ইউক্রেনীয় সংবিধান অনুযায়ী কোনো অঞ্চল ছেড়ে দেওয়া অবৈধ।
পুতিন ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চান, যার মধ্যে রয়েছে লুহানস্ক, দোনেৎস্ক, জাপোরিঝিয়া ও খেরসন, যা ২০২২ সালে রাশিয়া সংযুক্ত করে। ২০১৪ সালে সংযুক্ত হওয়া ক্রিমিয়াও এর অন্তর্ভুক্ত।
রাশিয়া বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ, অর্থাৎ এক লাখ ১৪ হাজার ৫০০ বর্গকিলোমিটার (৪৪ হাজার ৬০০ বর্গমাইল) এলাকা দখল করে আছে। রাশিয়া জাপোরিঝিয়া ও খেরসন অঞ্চলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নিয়ন্ত্রণ করে ও ডোনবাস অঞ্চলের (লুহানস্ক ও দোনেৎস্ক) প্রায় ৪৬ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকাও তাদের দখলে।
ডোনবাস অঞ্চলের কোস্টিয়ানটিনিভকা ও স্লোভিয়ানস্ক শহরের মধ্যে একটি কৌশলগত মহাসড়ক বরাবর একটি সুরক্ষিত অঞ্চল রয়েছে, যা ‘দুর্গ বলয়’ নামে পরিচিত। এটি গত ১১ বছর ধরে রাশিয়ার অগ্রগতির পথে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অফ ওয়ার (আইএসডব্লিও) জানিয়েছে, আগস্টে রাশিয়ার বাহিনী দুর্গ বলয় দখলের চেষ্টা তীব্রতর করেছে। দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার (৬ মাইল) এগিয়ে গেছে।
আল জাজিরার প্রতিরক্ষা সম্পাদক অ্যালেক্স গ্যাটাপোলোস বলেন, আমি নিশ্চিত নই যে ইউক্রেন ভূখণ্ডের দিক থেকে কী দিতে পারে। রাশিয়া সবকিছু ধরে রেখেছে ও ধীরে ধীরে এই সংঘাতে জয় লাভ করছে, যদিও এর জন্য অনেক মূল্য দিতে হচ্ছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে তিন বছরের এই যুদ্ধ ইউরোপের আধুনিক ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংঘাতগুলির মধ্যে অন্যতম। ২০২২ সালে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ কীভাবে এগিয়েছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো।
যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহগুলিতে রাশিয়া উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দিক থেকে দ্রুত ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডের বিশাল এলাকা দখল করে নেয়। এই সময় ইরপিন, বুচা ও মারিউপোলে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মারিউপোলের অবরোধ ছিল যুদ্ধের সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনাগুলির মধ্যে একটি, যেখানে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু হয়। ২০২২ সালের এপ্রিলের মধ্যে রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় ২৭ শতাংশ ভূখণ্ড নিজেদের দখলে নেয়। এই সময়ে রাশিয়া ইউরোপের বৃহত্তম জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রও দখল করে।
২০২২ সালের শেষের দিকে ইউক্রেন খারকিভ ও খেরসনে বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণের মাধ্যমে যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এতে তারা রাশিয়ার দখলকৃত ৫৪ শতাংশ ভূখণ্ডের মধ্যে প্রায় অর্ধেক পুনরুদ্ধার করে। ফলস্বরূপ, রাশিয়ার দখলে থাকা ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডের পরিমাণ দেশের মোট এলাকার মাত্র ১৮ শতাংশে নেমে আসে।
২০২৪ সালের আগস্টে ইউক্রেন রাশিয়ার কুর্স্ক অঞ্চলে একটি উল্লেখযোগ্য সামরিক অনুপ্রবেশ শুরু করে। তারা প্রায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত রাশিয়ার ভূখণ্ডে প্রবেশ করে ও প্রায় ২৫০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা দখল করে নেয়। যদিও পরে রাশিয়া এই অঞ্চল পুনরুদ্ধার করে, এই ঘটনা সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি নির্দেশ করে।
২০২৪ সালের শেষ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যুদ্ধ এক কঠিন অচলাবস্থায় পরিণত হয়। উভয় পক্ষই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। তবে, সম্প্রতি রাশিয়ার বাহিনী স্লোভিয়ানস্কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যা নতুন করে বড় ধরনের হামলার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
২০২২ সালে পূর্ণ মাত্রার আক্রমণ শুরুর আগে থেকেই রাশিয়া ২০১৪ সালে ইউক্রেনের ক্রিমিয়া দখল করে রেখেছিল। একই সঙ্গে, মস্কো ডোনবাস অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দিয়ে স্ব-ঘোষিত ডোনেটস্ক ও লুহানস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধের কারণে প্রায় এক কোটি ইউক্রেনীয় বাস্তুচ্যুত হয়েছে, যা তাদের যুদ্ধ-পূর্ব জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ। এর মধ্যে প্রায় ৩৭ লাখ ইউক্রেনের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হয়েছে ও ৬৯ লাখ মানুষ শরণার্থী হিসেবে বিদেশে পালিয়ে গেছেন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক