ভূখণ্ড নিয়ে ইউক্রেনের সঙ্গে ‘কোনো আপস নয়’ : রুশ কর্মকর্তা
রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা ও রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে আলোচনার পর একজন রুশ কর্মকর্তা বলেছেন, ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করার জন্য ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ‘কোনো আপস নয়’।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করছে। তারই অংশ হিসেবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) রাশিয়ার রাজধানীতে পুতিনের সঙ্গে দেখা করেন। খবর আল জাজিরার।
আরও পড়ুন: ভেনেজুয়েলা আক্রমণে প্রস্তুতি নিচ্ছেন ট্রাম্প?
আলোচনাটি প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ধরে চলেছিল। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ক্রেমলিনের শীর্ষ সহযোগী ইউরি উশাকভ। তিনি বলেছেন, এখন পর্যন্ত আমরা কোনো ধরনের সমঝোতায় আসতে পারিনি, তবে আমেরিকার দেওয়া কিছু সম্ভাব্য সমাধান নিয়ে আরও আলোচনা করা যেতে পারে।’
উশাকভ এই আলোচনাকে ‘খুব কার্যকর ও গঠনমূলক’ বললেও, তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, শান্তি আনতে হলে ওয়াশিংটন এবং মস্কো— উভয় পক্ষকেই এখনও অনেক কাজ করতে হবে।
মার্কিন প্রতিনিধি দল একটি শান্তি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েছিল, যা ওয়াশিংটন নতুন করে তৈরি করেছে। এর আগে যে ২৮-দফা খসড়া ফাঁস হয়েছিল, ইউক্রেন ও তাদের মিত্ররা সেটিকে রাশিয়ার পক্ষে বলে তীব্র সমালোচনা করেছিল। এর জবাবে ক্রেমলিন, কিয়েভ ও ইউরোপের দেওয়া পাল্টা প্রস্তাবের নিন্দা জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন বারবার বলেছেন যে, এই পাল্টা প্রস্তাব তাঁর দেশের কাছে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের আগে রাশিয়ার নেতা একটি বিনিয়োগ ফোরামে যুদ্ধ করার মনোভাব দেখিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি সেখানে দাবি করেন, তাঁর দেশ ইউরোপের বিরুদ্ধে লড়তে প্রস্তুত।
ইউক্রেনের ইউরোপীয় মিত্রদের কথা উল্লেখ করে পুতিন দাবি করেছেন, ‘তারা আসলে যুদ্ধের পক্ষে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি যে তাদের সব পরিবর্তন বা দাবি কেবল একটি উদ্দেশ্যেই করা হচ্ছে— তা হলো সম্পূর্ণ শান্তি প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেওয়া। আর তাদের এই ধরনের দাবিগুলো রাশিয়ার কাছে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।’
৭৩ বছর বয়সী এই নেতা আরও বলেছেন, তুরস্কের উপকূলে রাশিয়ার তেল বহনকারী জাহাজগুলোতে হামলার পর রাশিয়া ইউক্রেনীয় বন্দর ও জাহাজের পাশাপাশি কিয়েভকে সমর্থনকারী ট্যাঙ্কারগুলোতে আক্রমণ বৃদ্ধি করবে। তাঁর মন্তব্যের জবাবে, ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বলেন, এটা স্পষ্ট- পুতিন চান না যে যুদ্ধ শেষ হোক। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, গতকাল সোমবার তিনি বলেছিলেন- তিনি শীতকাল জুড়ে লড়াই করার জন্য প্রস্তুত। আজ, তিনি সমুদ্র বন্দর ও নৌচলাচলের স্বাধীনতার জন্য হুমকি দিচ্ছেন।
আরও পড়ুন: কৃষ্ণসাগরে ফের তেলের ট্যাঙ্কারে হামলা
এদিকে, আয়ারল্যান্ড সফরে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভোলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, একটি মর্যাদাপূর্ণ শান্তি প্রয়োজন। ডাবলিনে এক অনুষ্ঠানে যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল- তিনি কিয়েভের মিত্ররা ক্লান্ত হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন কিনা, তখন তিনি বলেছিলেন, তিনি ভয় পাচ্ছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, এই পরিস্থিতি থেকে আমেরিকার স্বার্থ প্রত্যাহার করা রাশিয়ার লক্ষ্য।’
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বীকার করেছেন, আলোচনা করা বেশ কঠিন ছিল। ওয়াশিংটন ডিসিতে মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে তিনি বলেন, আমাদের লোকেরা এখন রাশিয়ায় আছে, দেখছে যে আমরা এটি (যুদ্ধ) কোনোভাবে থামাতে পারি কিনা।’ তিনি আরও যোগ করেন, পরিস্থিতি সহজ নয়। কী জগাখিচুড়ি!
আরও পড়ুন: ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রে শান্তি আলোচনা
ট্রাম্প উল্লেখ করেন, এই যুদ্ধের কারণে প্রতি মাসে হাজার হাজার মানুষ হতাহত হচ্ছেন।
কিয়েভের একজন জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব সংবাদ সংস্থা এএফপিকে জানিয়েছেন, বুধবারের প্রথম দিকে ব্রাসেলসে উইটকফ ও কুশনার একটি ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে দেখা করতে পারেন।
রাশিয়ার দাবি, তারা ইউক্রেনের ডনবাসের বিশেষ গুরুত্ব সম্পন্ন শহর পোকরোভস্ক দখল করেছে। কিয়েভ অবশ্য এই ঘটনা অস্বীকার করে বলেছে, মস্কো এই ধারণা তৈরি করতে চায় যে রাশিয়ার অগ্রগতি অনিবার্য।
মস্কোর বাহিনী ইউক্রেনের ১৯ শতাংশেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করে, যা গত বছরের তুলনায় এক শতাংশ বেশি। রয়টার্সের উদ্ধৃত ইউক্রেনপন্থি মানচিত্র অনুসারে, রাশিয়ার সৈন্যরা ২০২২ সালের পর যেকোনো সময়ের তুলনায় ২০২৫ সালে আরও দ্রুত অগ্রসর হয়েছে।
এর আগে ফাঁস হওয়া মার্কিন শান্তি প্রস্তাবে রাশিয়ার দাবির মধ্যে ছিল- ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর আকার সীমিত করা, সমগ্র ডনবাসের উপর নিয়ন্ত্রণ এবং জাপোরিঝিয়া ও খেরসনের ইউক্রেনীয় অঞ্চলে মস্কোর উপস্থিতির স্বীকৃতি।
কিয়েভ বলেছে, এই ধরনের ছাড় আত্মসমর্পণ এর সমান হবে। জেলেনস্কি বলেছেন, চলমান আলোচনায় ইউক্রেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষা করা ‘সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’ হিসাবে রয়ে গেছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক