ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে ‘ভূখণ্ড ইস্যু’ নিয়ে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা
প্রায় চার বছর ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে বৈঠকে বসেছেন ইউক্রেন ও রাশিয়ার প্রতিনিধিরা। আলোচনায় প্রধান ইস্যু হিসেবে উঠে এসেছে ভূখণ্ড সংক্রান্ত বিরোধ।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) শুরু হওয়া এই আলোচনা ছিল যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা নিয়ে মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে প্রথম সরাসরি ও প্রকাশ্য বৈঠক। খবর আল জাজিরার।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সংকট নিরসনে সংলাপ এগিয়ে নেওয়া এবং রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার অংশ হিসেবে আবুধাবিতে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই বৈঠক দুই দিন ধরে চলবে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেন, আলোচনায় ভূখণ্ডগত বিরোধই হবে প্রধান বিষয়। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রাশিয়াকে এই যুদ্ধ শেষ করতে প্রস্তুত হতে হবে।
টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে জেলেনস্কি জানান, তিনি ইউক্রেনীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন, তবে শুক্রবারের আলোচনার ফলাফল সম্পর্কে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তিনি বলেন, আগামীকালের আলোচনা কেমন হয় এবং কী ফল বের হয়, সেটাই দেখা হবে।
এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে এমন এক সময়ে যখন এক দিন আগেই জেলেনস্কি সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ফাঁকে ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। একই সময়ে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে গভীর রাত পর্যন্ত বৈঠক করেন।
মস্কো থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদক ইউলিয়া শাপোভালোভা জানান, পুতিন ও উইটকফের বৈঠক প্রায় চার ঘণ্টা ধরে চলে, কিন্তু চুক্তির প্রধান বাধা—ভূখণ্ড বিরোধ ও নিরাপত্তা নিশ্চয়তা—এ বিষয়ে কোনো সমাধান আসেনি।
শাপোভালোভা বলেন, রাশিয়া দাবি করছে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীকে ডনবাস অঞ্চল ছেড়ে যেতে হবে, যা ইউক্রেনের কাছে একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ শুক্রবার বলেন, ইউক্রেনকে পুরো ডনবাস—ডোনেৎস্কের যে ২০ শতাংশ এখনো ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে আছে সেটিসহ—ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে রাশিয়ার অবস্থান ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত’।
ক্রেমলিনের পররাষ্ট্রনীতি উপদেষ্টা ইউরি উশাকভও বলেন, ভূখণ্ডগত সমস্যার সমাধান ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা সম্ভব নয়।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাস জানিয়েছে, আবুধাবির আলোচনায় সম্ভাব্য বাফার জোন ও নজরদারি ব্যবস্থার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে ইউক্রেন দাবি জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ হলে যাতে রাশিয়া আবার আগ্রাসন চালাতে না পারে, সে জন্য পশ্চিমা মিত্রদের—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের—কাছ থেকে শক্ত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
এদিকে রাশিয়ার হামলায় ইউক্রেনজুড়ে, বিশেষ করে রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এই শীতে ব্যাপক বিদ্যুৎ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। হাজার হাজার পরিবার তীব্র ঠান্ডায় মানবেতর জীবন যাপন করছে।
শুক্রবারের আলোচনার আগেই ইউক্রেন জানায়, খারকিভ অঞ্চলে রুশ হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন এবং দেশের পূর্বাঞ্চলে রাতে আরও চারজন নিহত হন—যাদের মধ্যে এক বাবা ও তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলেও রয়েছে।
যুদ্ধ চললেও ট্রাম্প এই সপ্তাহে বলেন, তিনি মনে করেন পুতিন ও জেলেনস্কি দুজনেই যুদ্ধ শেষ করতে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে চান। তিনি বলেন, আমার মনে হয় তারা এখন এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে তারা একসঙ্গে বসে একটি চুক্তি করতে পারে। আর যদি না পারে, তাহলে তারা দুজনই বোকামি করছে।
ক্রেমলিন জানিয়েছে, আবুধাবির আলোচনায় রাশিয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন অ্যাডমিরাল ইগর কোস্তিউকভ। প্রতিনিধি দলে মূলত সামরিক কর্মকর্তারাই রয়েছেন। পাশাপাশি পুতিনের দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ আলাদা করে স্টিভ উইটকফের সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।
যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত করেছে, আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন স্টিভ উইটকফ, ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার, আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ড্রিসকল এবং ন্যাটোর শীর্ষ জেনারেল, মার্কিন বিমান বাহিনীর জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেভিচ।
ইউক্রেনের প্রতিনিধিদলে রয়েছেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা পরিষদের প্রধান রুস্তেম উমেরভ, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান আন্দ্রি হ্নাতভ এবং প্রেসিডেন্ট দপ্তরের প্রধান কিরিলো বুদানভ।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক