পাকিস্তানে আত্মঘাতী হামলা : সীমান্ত সংযোগ-সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগ
পাকিস্তানের ইসলামাবাদে একটি শিয়া মসজিদে আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহতদের জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার পর দেশটিতে নিরাপত্তা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলা পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক বিভাজন উসকে দেওয়ার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হতে পারে।
স্থানীয় সময় শুক্রবার (৭ ফেব্রুয়ারি) জুমার নামাজের সময় রাজধানীর দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল তারলাই কালান এলাকায় অবস্থিত খাদিজাতুল কুবরা মসজিদে এক আত্মঘাতী হামলাকারী বিস্ফোরণ ঘটায়। হামলায় ৩০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন এবং অন্তত ১৬৯ জন আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হন বলে ইসলামাবাদ প্রশাসন জানিয়েছে। খবর আল জাজিরার।
পরে পাকিস্তানে সক্রিয় আইএসআইএল (আইএসআইএস)-এর একটি বিভক্ত গোষ্ঠী টেলিগ্রাম চ্যানেলে হামলার দায় স্বীকার করে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানান, মসজিদের নিরাপত্তারক্ষীরা হামলাকারীকে আটকানোর চেষ্টা করলে সে গুলি চালিয়ে বিস্ফোরণ ঘটায়। তিনি দাবি করেন, হামলাকারী আফগানিস্তান থেকে যাতায়াত করছিল।
নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তদন্তের অংশ হিসেবে পেশোয়ার ও করাচিতে হামলাকারীর পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে আটক করা হয়েছে। তবে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়ে এখনও নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
রাজধানীতে হামলার পুনরাবৃত্তি
গত কয়েক বছর রাজধানীতে তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি থাকলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে হামলার সংখ্যা বেড়েছে। গত বছরের নভেম্বরে একটি জেলা আদালতে আত্মঘাতী হামলার পর এটি দ্বিতীয় বড় হামলা।
গবেষণা সংস্থা ‘পাক ইনস্টিটিউট অব পিস স্টাডিজ’-এর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সারা দেশে ৬৯৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৪ শতাংশ বেশি।
পাকিস্তান বারবার অভিযোগ করে আসছে যে আফগান তালেবান সরকার দেশটির ভেতরে পাকিস্তানবিরোধী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দিচ্ছে। যদিও আফগান তালেবান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং মসজিদ হামলার নিন্দা জানিয়েছে।
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগান তালেবান পাকিস্তান তালেবান (টিটিপি)-কে সহায়তা দিচ্ছে। এছাড়া বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ)-র সঙ্গে টিটিপি ও আইএস-খোরাসানের যোগসূত্রের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার আশঙ্কা
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই হামলার লক্ষ্য ছিল শিয়া সম্প্রদায়কে টার্গেট করা। পাকিস্তানের প্রায় ২৫ কোটি মানুষের মধ্যে ২০ শতাংশের বেশি শিয়া মুসলিম। অতীতে বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়ার কুররম জেলায় সুন্নি-শিয়া সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। কুররম অঞ্চলে বর্তমানে শান্তি বিরাজ করলেও তা যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, তদন্ত দ্রুত ও স্বচ্ছভাবে শেষ করা না গেলে হামলাটি দেশজুড়ে নতুন করে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার জন্ম দিতে পারে। একই সঙ্গে উগ্র সুন্নি জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর নিয়োগ ও নেটওয়ার্ক বিস্তারের ক্ষেত্রেও এমন হামলা সহায়ক হতে পারে।
দেশটির সরকার বলছে, নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং হামলার পেছনের নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করতে অভিযান চলছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ পাকিস্তানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও সীমান্ত–রাজনীতিকে আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক