হংকংয়ের মিডিয়া মোগল জিমি লাইকে ২০ বছরের কারাদণ্ড
বেইজিং আরোপিত বিতর্কিত জাতীয় নিরাপত্তা আইনে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২০ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন হংকংয়ের প্রো-ডেমোক্রেসি গণমাধ্যম উদ্যোক্তা জিমি লাই।
আজ সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) আদালতের এক সারসংক্ষেপে জানানো হয়, তার বিরুদ্ধে দেওয়া ২০ বছরের সাজা থেকে ১৮ বছর আগের একটি জালিয়াতি মামলায় পাওয়া পাঁচ বছরের দণ্ডের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কার্যকর হবে। ৭৮ বছর বয়সী লাই ইতোমধ্যে পাঁচ বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন।
গত ডিসেম্বর তাকে দুইটি ‘বিদেশি শক্তির সঙ্গে আঁতাত’ এবং একটি ‘রাষ্ট্রদ্রোহমূলক প্রকাশনা’–সংক্রান্ত অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। বয়স ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় এই সাজা কার্যত তার বাকি জীবন কারাগারেই কাটানোর আশঙ্কা তৈরি করেছে।
রায় ঘোষণার আগে মানবাধিকার সংগঠন ও পশ্চিমা দেশগুলো তার মুক্তির দাবি জানায়। কেউ কেউ এই বিচারকে ‘প্রহসন’ বলে আখ্যা দেন। লাইয়ের পরিবার ও আইনজীবীরা জানিয়েছেন, হৃদস্পন্দনের সমস্যা ও উচ্চ রক্তচাপসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন তিনি; ফলে কারাগারে তার জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
আদালত কক্ষ ত্যাগের সময় লাইকে গম্ভীর দেখা যায়, দর্শক সারির কয়েকজন কান্নায় ভেঙে পড়েন।
লাইয়ের পাশাপাশি বিলুপ্ত ‘অ্যাপল ডেইলি’ পত্রিকার ছয়জন সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, একজন কর্মী ও একজন প্যারালিগালকেও সাজা দেওয়া হয়েছে। সহঅভিযুক্তদের কারাদণ্ড ৬ বছর ৩ মাস থেকে ১০ বছর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন প্রকাশক চিয়াং কিম-হাং, সহযোগী প্রকাশক চ্যান পুই-ম্যান, সম্পাদক-ইন-চিফ রায়ান ল, নির্বাহী সম্পাদক লাম মান-চুং, ইংরেজি বিভাগের নির্বাহী সম্পাদক ফাং ওয়াই-কং এবং সম্পাদকীয় লেখক ইয়েউং চিং-কী।
সাংবাদিকদের সুরক্ষা বিষয়ক সংগঠন ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস’ বলেছে, শুরু থেকেই এই বিচার প্রক্রিয়া ছিল ‘প্রহসন’ এবং এটি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে। ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’ জানিয়েছে, এই সাজা হংকংয়ে গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠোর বার্তা দেবে।
তবে বেইজিং এসব সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, হংকংয়ের বিচারব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। হংকং কর্তৃপক্ষের দাবি, লাইয়ের মামলার সঙ্গে মতপ্রকাশ বা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কোনো সম্পর্ক নেই।
২০২০ সালে জাতীয় নিরাপত্তা আইন জারির পর লাই ছিলেন প্রথম গ্রেপ্তার হওয়া উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের একজন। এক বছরের মধ্যে ‘অ্যাপল ডেইলি’র কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকও গ্রেপ্তার হন। পুলিশি অভিযান, মামলা ও সম্পদ জব্দের ফলে ২০২১ সালের জুনে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। শেষ সংস্করণটি এক মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছিল।
লাইয়ের সাজা চীন ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র তার দণ্ডের সমালোচনা করেছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার জানিয়েছেন, গত মাসে বেইজিং সফরে তিনি চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে লাইয়ের বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন। জিমি লাই একজন ব্রিটিশ নাগরিক।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও রায়ের পর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, তিনি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে লাইয়ের মুক্তির বিষয়টি আলোচনা করেছেন।
লাইয়ের মেয়ে ক্লেয়ার লাই বলেছেন, আমরা কখনও লড়াই থামাব না, যতক্ষণ না তিনি মুক্ত হন।
এদিকে হংকংয়ে সংবাদমাধ্যমের ওপর বিধিনিষেধ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই রায় দেওয়া হলো। হংকং সাংবাদিক সমিতি জানিয়েছে, ২০২৪ সালে বহু সাংবাদিক পদ্ধতিগত হয়রানি ও ভয়ভীতির শিকার হয়েছেন। ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স’–এর তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা আইন কার্যকরের পর চার বছরে অন্তত ৯০০ সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক