বিক্ষোভের পর অর্থনৈতিক চাপে ইরান, বন্ধ অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান
গত মাসে দেশজুড়ে প্রাণঘাতী বিক্ষোভের পর ইরানে একাধিক ব্যক্তিমালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। একই সময়ে দেশটির অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েনের মধ্যেই কূটনৈতিক আলোচনা চলছে।
পুলিশ বা বিচার বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করে জানায়নি কেন এসব ব্যবসা বন্ধ করা হয়েছে। তবে তেহরানের কেন্দ্র ও উত্তরাঞ্চলের জনপ্রিয় ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, আর্ট গ্যালারি ও ছোট ব্যবসাগুলোর অনেকেই ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়েছিল বা ধর্মঘটে অংশ নিয়েছিল। খবর আল জাজিরার।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ডজনখানেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে জনপরিসর তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ বিভাগ। বন্ধ হওয়া প্রতিষ্ঠানের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানানো হয়, তাদের কার্যক্রম ‘দেশের নিয়ম ও পুলিশি বিধিমালা লঙ্ঘন’ করেছে।
রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স এক প্রতিবেদনে একটি কথিত ‘স্বীকারোক্তিপত্র’ প্রকাশ করেছে, যা ৮১ বছর বয়সী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী সাদেনিয়ার নামে প্রচারিত হয়েছে। তিনি ও তার পরিবার দেশজুড়ে জনপ্রিয় একাধিক ক্যাফে ও খাদ্য ব্র্যান্ড পরিচালনা করতেন। বিচার বিভাগ জানিয়েছে, বিক্ষোভ-পরবর্তী সময়ে তিনি কারাবন্দি, তার সব ব্যবসা বন্ধ এবং সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।
হতাহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত
সরকারি হিসাবে, বিক্ষোভে তিন হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। সরকার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মদদপুষ্ট ‘সন্ত্রাসী ও দাঙ্গাবাজদের’ দায়ী করেছে। তবে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করেছে, বিক্ষোভ দমনে অতিরিক্ত প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সির হিসাবে, মৃতের সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার ৯৬৪ এবং আরও বহু ঘটনার তদন্ত চলছে। জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক মাই সাতো বলেছেন, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
অর্থনীতিতে চাপ
বিক্ষোভের এক মাসেরও বেশি সময় পর ইরানের অর্থনীতি চাপে রয়েছে। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বাজারে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দর ছিল প্রায় ১৬ লাখ ২০ হাজার রিয়াল, যা প্রায় রেকর্ড নিম্নমুখী অবস্থান।
তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারে দোকানপাট খোলা থাকলেও ব্যবসা আগের তুলনায় কম। এক ব্যবসায়ী জানান, আগের তুলনায় বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। লেনদেনও এখন বেশিরভাগই নগদে হচ্ছে।
ডাউনটাউন জোমহুরি এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি এখনও চোখে পড়ে। অনেক সময় চেকপোস্ট বসানো হচ্ছে।
বিপ্লব বার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের বার্ষিকী উপলক্ষে দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি জনগণকে সমাবেশে অংশ নিয়ে ‘শত্রুকে হতাশ’ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে, বিক্ষোভ-পরবর্তী সংস্কারের আহ্বান জানানো কয়েকজন প্রভাবশালী সংস্কারপন্থী নেতাকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন
ওমানের মধ্যস্থতায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনা হলেও উভয় পক্ষের মধ্যে হুমকি-পাল্টা হুমকি চলছে। যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছে।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের সমর্থন চাইছেন। তবে কূটনৈতিক তৎপরতার মাঝেই ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক সংকট দেশটিকে চাপে রেখেছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক