প্রতিরোধের ডাক দিলেন মোজতবা খামেনি
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোতজবা খামেনি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে তাদের মাটিতে থাকা সব মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বন্ধ করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আজ বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রথম বক্তব্যে তিনি মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ডাক দেন। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
বৃহস্পতিবার ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের এক সংবাদ পাঠিকার পাঠ করা বিবৃতিতে খামেনি বলেন, ‘আমি পরামর্শ দিচ্ছি, তারা (মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো) যেন যত দ্রুত সম্ভব মার্কিন ঘাঁটিগুলো বন্ধ করে দেয়; কারণ তারা নিশ্চয়ই এতক্ষণে উপলব্ধি করতে পেরেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবিটি মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়।’
মোজতবা খামেনি বলেন, তাঁর দেশের বাহিনীকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি অবশ্যই বন্ধ রাখতে হবে। দেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি এই আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি অবরোধের এই অস্ত্রটি অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে।’
গত রোববার সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত হওয়ার পর আয়াতুল্লাহ মোতজবা খামেনিকে এখনো জনসম্মুখে দেখা যায়নি; শোনা যাচ্ছে তিনি একটি বিমান হামলায় আহত হয়েছেন। তাঁর এই আপসহীন বার্তাটি ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে একজন সংবাদ পাঠিকার মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। মোতজবা খামেনির বাবা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার প্রথম দফায় নিহত হন।
বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন হয়। এই জলপথ সম্পর্কে খামেনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি অবরোধের অস্ত্রটি অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধের একটি সীমিত অংশ দৃশ্যমান হয়েছে, তবে লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত এটি আমাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে।’
এদিকে, আজ বৃহস্পতিবার জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে ইরানের নতুন দফা হামলার পর তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, এই সংকট ইতিহাসের বৃহত্তম সরবরাহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
জাহাজে হামলা ও ক্ষয়ক্ষতি
বৃহস্পতিবার বাহরাইনের মুহারাকে জ্বালানি ট্যাঙ্কারে হামলার পর ঘন কালো ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে; বাসিন্দাদের ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দুবাইয়ের প্রাণকেন্দ্রে ড্রোন হামলায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা তাদের শায়বাহ তেল ক্ষেত্র এবং দূতাবাস এলাকার দিকে আসা ড্রোনগুলো প্রতিহত করেছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে আছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরাকের উপকূলীয় এলাকায় আরও তিনটি জাহাজে হামলা হয়েছে। প্যারিস-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) সতর্ক করে বলেছে, ১৩ দিনের এই সংঘাত বৈশ্বিক তেলের বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ সংকট তৈরি করছে, যা ১৯৭০-এর দশকের সংকটকেও ছাড়িয়ে যাবে।
ভুল হিসাব
ইরানের একজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন যে, দেশটিকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে বাধ্য করলে তা বিশ্ব অর্থনীতিকে ‘ধ্বংস’ করে দেবে। অন্যদিকে ট্রাম্প অবিলম্বে বিমান হামলা বন্ধের সম্ভাবনা নাকচ করে দিলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, মার্কিন বাহিনীর কাছে আঘাত করার মতো লক্ষ্যবস্তু ফুরিয়ে আসছে।
মেডিটেরেনিয়ান ফাউন্ডেশন ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের পরিচালক পিয়েরে রাজক্স এএফপি-কে বলেন, হোয়াইট হাউস যদি মনে করে ডোনাল্ড ট্রাম্প চাইলেই এই সংঘাত থেমে যাবে, তবে তারা ভুল করছে। ইরানি শাসনব্যবস্থার এখন হারানোর কিছু নেই, তারা এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধ’ চালিয়ে যাবে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা
যুদ্ধ এখন পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় কয়েকশ মানুষ নিহত হয়েছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সৈন্যদের লেবাননে হামলা আরও বিস্তৃত করার প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। লেবাননে এখন পর্যন্ত ৬৮৭ জন নিহত এবং ৮ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘের তথ্যমতে ইরানে ৩ কোটিরও বেশি মানুষ যুদ্ধকালীন বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছে।
ইসরায়েলি বাহিনী বৃহস্পতিবার তেহরানের দক্ষিণ-পূর্বে একটি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। স্যাটেলাইট চিত্রে পারচিন সামরিক ঘাঁটিতে ‘বাঙ্কার-বাস্টার’ বোমার আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। মার্কিন বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের ২৮টি মাইন স্থাপনকারী জাহাজ ধ্বংস করেছে।
তেলের বাজারে অস্থিরতা
আইইএ-র সমন্বয়ে সদস্য দেশগুলো তাদের জরুরি মজুত থেকে রেকর্ড পরিমাণ তেল বাজারে ছাড়ার ঘোষণা দিলেও দাম ১০০ ডলারের নিচে নামানো সম্ভব হয়নি। এসপিআই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের বিশ্লেষক স্টিফেন ইননেস মন্তব্য করেছেন, বাজারের ভাষায় বলতে গেলে, আইইএ-র এই তেল ছাড়ার ঘোষণা অনেকটা রিফাইনারির ভয়াবহ আগুনে বাগানের পানির পাইপ দিয়ে পানি ছেটানোর মতো।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২০০-এর বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। ইসরায়েলে ১৪ জন এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে ১১ জন বেসামরিক নাগরিক ও ৭ জন মার্কিন সেনাসহ মোট ২৪ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের এখন পর্যন্ত ১১.৩ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি খরচ হয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক