ইরান যুদ্ধে ট্রাম্পের ‘জয়’ না পাওয়ার ৭ কারণ
ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র দুই সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও এক জটিল গোলকধাঁধায় আটকে পড়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধের প্রথম প্রহরেই বড় ধরনের সামরিক সাফল্যের দাবি করে ট্রাম্প ‘বিজয়’ ঘোষণা করলেও, রণক্ষেত্রের বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। একদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বিমান হামলায় ইরানের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে তেহরানের কৌশলগত পাল্টা আঘাত সংঘাতকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছে যেখানে বিজয় এখন কেবলই একটি শব্দে পরিণত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসন এখন এক দ্বিমুখী সংকটের মুখোমুখি। একদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া মানেই তেলের আকাশচুম্বী দাম আর মার্কিন অর্থনীতির ওপর প্রবল চাপ, অন্যদিকে এই মুহূর্তে পিছু হটা মানে বিশ্বরাজনীতিতে চরম পরাজয় বরণ করা। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতায় আরোহণ ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে, নিছক সামরিক শক্তি দিয়ে এই অঞ্চলের গভীর রাজনৈতিক ও কৌশলগত সমীকরণ মেলানো অসম্ভব। ঠিক কোন কোন জটিলতার কারণে ট্রাম্পের জন্য এই যুদ্ধে জয় নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে, তার সাতটি প্রধান কারণ তুলে ধরা হলো :
১. হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান এটি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। মার্কিন নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন লরেন্স ব্রেনানের মতে, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা ছাড়া জয় সম্ভব নয়। বর্তমানে সস্তা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইরান এই জলপথটি বন্ধ করে রেখেছে, যা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য একটি বিশাল সামরিক ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২. সর্বোচ্চ নেতার উত্তরসূরি ও রাজনৈতিক স্থবিরতা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি হামলায় আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন ভেবেছিল শাসনব্যবস্থার পতন ঘটবে। কিন্তু দ্রুত তার পুত্র মোজতবা খামেনির ক্ষমতা গ্রহণ সেই আশাকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। ট্রাম্প ইরানিদের বিদ্রোহের ডাক দিলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো বড় গণঅভ্যুত্থান দেখা যায়নি, বরং নতুন নেতার অধীনে ইরান আরও কট্টর অবস্থান নিয়েছে।
৩. ইসরায়েলের সঙ্গে কৌশলগত লক্ষ্যভেদ
ট্রাম্প রাজনৈতিক কারণে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চাইলেও ইসরায়েলের লক্ষ্য ভিন্ন। ইসরায়েল এই সংঘাতকে একটি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক নিরাপত্তা মিশন হিসেবে দেখছে। ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর মধ্যে "পারস্পরিক সিদ্ধান্তের" বিষয়টি মার্কিন মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, কারণ ইসরায়েলি বাহিনী সিরিয়া, লেবানন ও ইরানে তাদের অভিযান চালিয়ে যেতে চায় যা ট্রাম্পের দ্রুত যুদ্ধ শেষের পরিকল্পনার সাথে সাংঘর্ষিক।
৪. পারমাণবিক কর্মসূচির অনিশ্চয়তা
ট্রাম্প দাবি করেছেন তিনি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ‘নিশ্চিহ্ন’ করেছেন। কিন্তু জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষণ সংস্থার মতে, ইসফাহান কেন্দ্রে এখনও প্রায় ২০০ কেজি উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে। এই মজুদ পুরোপুরি নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র কখনই নিশ্চিত হতে পারবে না যে ইরান ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। এটি ধ্বংস করতে হলে বিশাল স্থল অভিযানের প্রয়োজন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
৫. অভ্যন্তরীণ সহিংসতা ও জনঅসন্তোষ
যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও পড়তে শুরু করেছে। ভার্জিনিয়া এবং মিশিগানে সাম্প্রতিক সহিংস ঘটনা ও ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর হামলা যুদ্ধের অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
৬. সামরিক দুর্ঘটনার ক্রমবর্ধমান ব্যয়
যদিও মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রযুক্তিগতভাবে অতুলনীয়, তবুও যুদ্ধে সাতজন মার্কিন সেনার মৃত্যু ও ইরাকে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমানের দুর্ঘটনা যুদ্ধের প্রকৃত খরচকে সামনে নিয়ে আসছে। তেলের দাম বাড়ার পাশাপাশি এই বিশাল সামরিক অভিযানের খরচ মার্কিন বাজেটে চাপ সৃষ্টি করছে, যা ভোটারদের মধ্যে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে।
৭. যুদ্ধের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞার অভাব
ট্রাম্প প্রশাসন শুরু থেকেই যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে। কখনো বলা হচ্ছে এটি পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংসের জন্য, আবার কখনো বলা হচ্ছে এটি শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য। বিজয়ের কোনো পরিষ্কার ও গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা দিতে না পারায় ট্রাম্পের জন্য ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’কে একটি সফল অভিযান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক