যুদ্ধ ও সংকটের ছায়ায় এবারের ইরানি নববর্ষ ‘নওরোজ’
নওরোজ বা পারস্য নববর্ষ হলো পরিবারের মিলনমেলা, নবায়ন করা এবং নতুন শুরুর অঙ্গীকারের সময়। বসন্ত বিষুবের দিনে উদযাপিত এই উৎসব ইরানসহ বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষের কাছে এক ‘নতুন দিনের’ বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু অনেক ইরানির জন্য এ বছরের উৎসবে বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই। খবর সিএনএনের।
একদিকে এক ক্ষতবিক্ষত ও ক্রুদ্ধ অথচ গভীরভাবে জেঁকে বসা শাসকগোষ্ঠী, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অবিরাম হামলা—যার ফলে হাজার হাজার মানুষ নিহত ও আহত হয়েছে এবং দেশের অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। এই দুইয়ের মাঝে পিষ্ট ইরানিরা এবার এক ভিন্নতর নওরোজের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তেহরানের ৩৬ বছর বয়সী বাসিন্দা নাজনীন বলেন, “বসন্তের জন্য ঘর গোছানো বা ‘হাফত সিন’ সাজানোর মতো কোনো শক্তি আমার নেই।” নবায়ন, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে পরিবারগুলো ঐতিহ্যগতভাবে যে সাতটি উপকরণ দিয়ে টেবিল সাজায়, তাকেই ‘হাফত সিন’ বলা হয়। নাজনীন আক্ষেপ করে বলেন, ‘যখন পরিবারের সবার সঙ্গে দেখা করতে পারছি না, সবাই একসাথে হতে পারছি না, তখন কীভাবে উদযাপন করি?’
সিএনএন-এর সঙ্গে কথা বলা নাজনীন এবং অন্যান্য ইরানিদের (যাদের পরিচয় রক্ষার্থে পুরো নাম প্রকাশ করা হয়নি) কাছে গত তিন সপ্তাহ ছিল চরম হতাশা ও আতঙ্কে ভরা। নাজনীন বলেন, “সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। আমরা প্রতিদিন কোনো এক অতল গহ্বরের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকি। ‘চাহারশানবে সুরি’ (পারস্যের অগ্নি উৎসব) বা নওরোজের মতো সময়ের চিরাচরিত উপলক্ষগুলো এখন অর্থহীন মনে হচ্ছে।”
যুদ্ধ সত্ত্বেও তেহরানে নওরোজের প্রস্তুতি থেমে নেই। বাজারে প্রচুর পণ্য রয়েছে, অলিগলিতে নওরোজের ঐতিহ্যবাহী ফুল হায়াসিন্থের সুবাস জানান দিচ্ছে যে শহরে বসন্ত এসেছে। কিন্তু নাজনীনের মতো অনেকে হতাশ হলেও, কেউ কেউ আবার আশার আলো দেখছেন।
রাজধানীর দীর্ঘদিনের বাসিন্দা মেহরাদ বলেন, ‘যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মনে হচ্ছে শহরটা যেন কিছুটা হালকা হয়েছে, যদিও আমাদের ওপর বোমাবর্ষণ চলছে। আকাশ এখন পরিষ্কার ও নীল, ধোঁয়াশাও কেটে গেছে। মনে হচ্ছে শহরটা জানে যে আমরা খুব শিগগিরই মুক্ত হতে যাচ্ছি।’
বিভক্ত এই সমাজের কেউ কেউ এ বছরের নওরোজের শুদ্ধি ও পুনর্জন্মের দর্শনের মধ্যে বিশেষ তাৎপর্য খুঁজে পাচ্ছেন। ৪৫ বছর বয়সী আহমদ বলেন, ‘আমি অলৌকিক চিহ্নে বিশ্বাস করি না, কিন্তু হয়তো নওরোজের ঠিক আগমুহূর্তে এই সবকিছু ঘটার পেছনে কোনো কারণ আছে।’ তিনি এবং তাঁর স্ত্রী আগের মতোই নওরোজ পালনের পরিকল্পনা করছেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘এই ঐতিহ্যগুলো হলো আনন্দের মুহূর্ত। গত কয়েক মাসে আমরা প্রচুর মৃত্যু দেখেছি; আমি মনে করি জীবনকে সম্মান জানানো এখন জরুরি, তাদের (শাসকগোষ্ঠী) মাধ্যমে আমাদের এই আনন্দ কেড়ে নিতে দেওয়া উচিত নয়।’
এ বছরের নওরোজের আনন্দ কেবল যুদ্ধেই ম্লান হয়নি। সংঘাত শুরুর আগে থেকেই দেশটি ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে ছিল। সরকারি অব্যবস্থাপনা এবং কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞার ফলে সৃষ্ট উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্বের কারণে গত বছরের ডিসেম্বরের শেষে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, যা নিরাপত্তা বাহিনীর রক্তাক্ত দমনের মাধ্যমে শেষ হয়।
যে অর্থনৈতিক দুরবস্থা বিক্ষোভের আগুন জ্বালিয়েছিল, তার কোনো পরিবর্তন হয়নি। সাধারণ ইরানিদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনাই এখন অসাধ্য। অনেকের কাছে নওরোজ উদযাপনের বাড়তি খরচ বহন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরানের এক বাসিন্দা জানান, তিনি নববর্ষ পালন করলেও ফুল কেনা বা ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরির খরচ মেলাতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘বাজারে পণ্যের অভাব নেই, কিন্তু টাটকা শাকসবজি, মাছ বা ফুল কেনা এখন বিলাসিতা, বিশেষ করে যখন আমাদের ভবিষ্যতের কোনো নিশ্চয়তা নেই।’
এবারের ইরানি নববর্ষ রমজানের শেষ এবং ঈদুল ফিতর উদযাপনের সময়ের সঙ্গে মিলে গেছে। ইরানি সরকার পবিত্র মাস শেষে রাষ্ট্রীয় প্রার্থনার আয়োজন করবে, যা চাপের মুখে থাকা এই শাসকগোষ্ঠীর জন্য শক্তি ও ঐক্যের আরেকটি প্রদর্শনী হতে পারে।
তবে বর্ণ, ধর্ম বা মতাদর্শ নির্বিশেষে অধিকাংশ ইরানির কাছে এই যুদ্ধের সময়েও নওরোজই মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যা একেকজনের কাছে নিয়ে এসেছে একেক রকম ভিন্ন অর্থ।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক