ট্রাম্প চাইলেও কি ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন?
অবৈধভাবে আরোপ করা শুল্কের মতো যুদ্ধকে কোনো প্রেসিডেন্টের খেয়ালখুশি মতো শুরু বা শেষ করা যায় না, আবার ধসে পড়া বাজারকে স্থায়ীভাবে চাঙ্গা করার জন্য যখন-তখন চালু বা বন্ধ করা যায় না। তাই ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে হামলার হুমকি স্থগিত করার পর এখন সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নটি হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্পের জীবনে আরেকটি ‘টাকো’ (টিএসিও- ট্রাম্প অলওয়েজ চিকেন্স আউট) মুহূর্ত এলো কি না। আসল প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প যদি চানও, তবুও তিনি ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন কি না। খবর সিএনএনের।
কয়েক দিনের অস্থির বাগাড়ম্বরের পর, গতকাল সোমবার (২৩ মার্চ) প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই দ্বন্দ্বে প্রথম সম্ভাব্য উত্তেজনা প্রশমনের সংকেত দেন। তিনি ইরানের সঙ্গে ‘ফলপ্রসূ’ আলোচনায় ১৫টি বিষয়ে ঐকমত্যের কথা উল্লেখ করেন। যদিও তেহরান জানিয়েছে, তাদের মধ্যে কোনো সংলাপই হয়নি। এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ইতিবাচক ব্যাখ্যা হতে পারে যে—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান উভয়ই এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে সংঘাত আরও বাড়ানো দুই পক্ষের জন্যই এত ভয়াবহ হবে যে, এখন উভয়েরই সংঘাত থেকে একটি পালানোর পথ দরকার। এ ধরনের উপলব্ধিই কেবল যুদ্ধ শেষ করতে সাহায্য করে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে যুদ্ধের কিনারায় নিয়ে গিয়েছিলেন এই হুমকি দিয়ে যে—যদি তারা হরমুজ প্রণালি (তেল রপ্তানির প্রধান পথ) খুলে না দেয়, তবে তিনি ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে বোমা ফেলবেন। পাল্টা জবাবে তেহরান মার্কিনিদের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো জ্বালিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। এই সংঘাত বিশ্বজুড়ে মন্দা ডেকে আনতে পারত এবং ইরানি বেসামরিক নাগরিকদের মানবিক অবস্থাকে আরও শোচনীয় করে তুলত।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের খামখেয়ালি এবং পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা এবং এই যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ বা বেরিয়ে আসার কৌশল দেখাতে প্রশাসনের ব্যর্থতা প্রমাণ করে, যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো একক বিবৃতির বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। নিজের দেওয়া সময়সীমার মধ্যেই বোমা ফেলার অভ্যাস ট্রাম্পের আছে, তাই তিনি যদি ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে হামলার ওপর দেওয়া তার পাঁচ দিনের স্থগিতাদেশ নিজেই ভেঙে ফেলেন, তবে কেউ অবাক হবে না।
কেন ট্রাম্পকে উত্তেজনা কমাতে হবে?
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্য একটি কারণেও সময়ক্ষেপণ করতে পারেন- ইরানের তেল শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু খার্গ দ্বীপ আক্রমণ বা হরমুজ প্রণালির উপকূলীয় অঞ্চল দখলের জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন বাহিনী এখনো পুরোপুরি একত্রিত হয়নি। জাপান থেকে আসা একটি মার্কিন মেরিন ইউনিট শিগগিরই পৌঁছাতে পারে, তবে পশ্চিম উপকূল থেকে রওনা দেওয়া দ্বিতীয় ইউনিটটি মাত্র গত সপ্তাহে যাত্রা শুরু করেছে।
এটিও মনে রাখা জরুরি যে, ট্রাম্প অতিশয়োক্তি পছন্দ করেন। কূটনৈতিক অগ্রগতির বিষয়ে তার বাড়িয়ে বলা এবং ইরান চুক্তির জন্য ‘অত্যন্ত ব্যাকুল’—এমন দাবিগুলো অতিরঞ্জিত হতে পারে। যদিও রাষ্ট্রনায়করা মাঝে মাঝে সাফল্যের পথ তৈরি করতে সচেতনভাবে এমন কৌশলী মিথ্যা বলে থাকেন।
এক দিন যুদ্ধ কমানোর কথা বলা এবং পরের দিনই তা বাড়িয়ে দেওয়ার মতো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বন্য আচরণ একজন স্থিতিশীল যুদ্ধ-নেতার ঐতিহ্যের পরিপন্থি। তবে এটাই ট্রাম্পের চিরচেনা রূপ। সোমবারের মধ্যে মনে হচ্ছিল, এসবই একটি চাল ছিল যাতে তিনি দাবি করতে পারেন যে—তার ‘কঠোর নীতি’র কারণেই কূটনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। নিজের তৈরি করা সংকট প্রশমনের এই প্রবণতা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবন, ব্যবসা এবং রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের মতোই পরিচিত। প্রতিদিনের লড়াই তার কাছে কেবল দিনশেষে টিকে থাকার চেষ্টা।
তবুও একটি আশঙ্কার বিষয় হলো, পারস্য উপসাগরে ট্রাম্পের এই খামখেয়ালি পদ্ধতি তার সীমার বাইরে চলে যেতে পারে। মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরান হয়তো শক্তিতে পিছিয়ে থাকতে পারে এবং তাদের নৌ, বিমান ও স্থল সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে, যা ইসলামি শাসনব্যবস্থার শীর্ষ সদস্যদেরও নির্মূল করতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ এখন চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে এবং ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতি এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক আশা-আকাঙ্ক্ষাকে জিম্মি করার ক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
পাকিস্তানের উদ্যোগে যুদ্ধ থামাতে যদি আলোচনা শুরুও হয়, এতে ইরানের পক্ষে কে কথা বলবে তা স্পষ্ট নয়। যে শাসনব্যবস্থার কর্তৃত্ব বিকেন্দ্রীভূত হয়েছে এবং যারা প্রধান নেতাদের হারিয়েছে, তাদের পক্ষে সম্মিলিত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন। তাছাড়া, অতীতে ওয়াশিংটন ইরানের অপেক্ষাকৃত উদারপন্থিদের সাথে কথা বললেও দেখা গেছে কট্টরপন্থিরা শেষ পর্যন্ত কোনো আপস করতে দেয়নি।
কেন ট্রাম্পের সব পথই কঠিন?
ইরানে ভবিষ্যতে কী ঘটবে তা কেউ জানে না। হতে পারে শীর্ষ নেতাদের হত্যাকাণ্ড এবং মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় শাসনব্যবস্থায় এমন ফাটল ধরেছে যা এখনো দৃশ্যমান নয়। কিন্তু জনসমক্ষে পতনের কোনো স্পষ্ট চিহ্ন নেই।
বিমান হামলা ইরানের আঞ্চলিক হুমকিকে কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। কিন্তু যদি পাশবিক শক্তি তাদের হাঁটু গেড়ে বসাতে না পারে, তবে ইরান কেন তাদের প্রধান শক্তি (হরমুজ প্রণালি) ছেড়ে দেবে—তার কোনো ব্যাখ্যা ট্রাম্প দেননি।
তবে কেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনার সম্ভাবনার বিষয়ে প্রলুব্ধ হচ্ছেন, তা সহজেই বোঝা যায়। তার একটি বেরোনোর পথ প্রয়োজন, কারণ তার সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর বেশিরভাগই আকর্ষণীয় নয়। তিনি বর্তমান অবস্থায় যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারেন, কিন্তু এতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে—এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। তিনি স্থল সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, কিন্তু এটি এমন একটি রাজনৈতিক সীমা অতিক্রম করবে যা ট্রাম্প নিজেই বারবার বিরোধিতা করে এসেছেন।
এই অবস্থায় ‘টাকো’ (টিএসিও-ট্রাম্প অলওয়েজ চিকেন্স আউট, ডেমোক্র্যাটদের ব্যবহৃত উপহাসমূলক এই কথাটির অর্থ হলো- ট্রাম্প সবসময় ভয়ে পিছিয়ে আসেন) বিকল্পটি গ্রহণ করা—অর্থাৎ জয় ঘোষণা করে সরে আসা (তা প্রকৃত জয় হোক বা না হোক)—বেশ আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। কিন্তু এভাবে চলে গেলে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্ররা একটি ক্রুদ্ধ ও শক্তিশালী ইরানের সামনে অরক্ষিত হয়ে পড়বে। আবার ইরানের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদ ধ্বংস না করে যুদ্ধ শেষ করলে তারা যেকোনো দিন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে ফেলতে পারে, যা ট্রাম্পের যুদ্ধের মূল কারণকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
প্রেসিডেন্টরা প্রায়ই এমন সংকটের মুখোমুখি হন যেখানে কোনো ভালো বিকল্প থাকে না, কিন্তু খুব কমই ট্রাম্পের মতো এমন একটি জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হন যা তিনি নিজেই নিজের জন্য তৈরি করেছেন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক