হরমুজ প্রণালি ‘যেকোনো উপায়ে’ খুলে দেওয়া হবে : মার্কো রুবিও
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের সম্ভাব্য সমাপ্তি টানার পর হরমুজ প্রণালি ‘যেকোনো উপায়ে’ পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। আজ সোমবার (৩০ মার্চ) কাতার ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন।
সাক্ষাৎকারটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হলো যখন ইরানে মার্কিন সেনা মোতায়েনের সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা বাড়ছে এবং প্রণালিটি কার্যত বন্ধ থাকায় তেলের বিশ্ব বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের একটি নতুন ধাপ হবে মার্কিন পদাতিক বাহিনীর উপস্থিতি, যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বারবার বলে আসছেন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে কূটনীতির পথে হাঁটছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও দাবি করেছেন, ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি আলোচনা চলছে, যা মূলত মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তবে ইরান বারবার আলোচনার কথা অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, পাকিস্তান গতকাল রোববার বলেছে যে, তারা চলমান সংঘাতের একটি ব্যাপক এবং স্থায়ী সমাধানের জন্য আগামী দিনগুলোতে সরাসরি আলোচনার আয়োজন করবে।
মার্কো রুবিও আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সবসময় কূটনীতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন এবং একটি সমাধান খুঁজছেন—যা হয়তো আগেই অর্জন করা সম্ভব ছিল।’
ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ও পারমাণবিক অস্ত্র প্রসঙ্গ
ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে পরোক্ষ আলোচনা চালিয়েছিল। কিন্তু গত বছর ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের কারণে সেই আলোচনা ভেস্তে যায়, যা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার মাধ্যমে শেষ হয়েছিল। দ্বিতীয় দফা কূটনীতি চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন চলতে থাকা যুদ্ধ শুরু করে।
রুবিও আবারও ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ব্যাপারে মার্কিন প্রশাসনের পছন্দের কথা ইঙ্গিত করেন, যা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তির হত্যাকাণ্ডের পরেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখন পর্যন্ত অর্জন করতে পারেনি। রুবিও বলেন, ‘আমরা এমন একটি দৃশ্যপটকে স্বাগত জানাব যেখানে ইরান এমন ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হবে যাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে এবং যদি এমন সুযোগ আসে, তবে আমরা তা লুফে নেব।’
আলজাজিরার সঙ্গে আলাপকালে রুবিও ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধের পাশাপাশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি বন্ধে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি ইরানকে বিশ্বকে ভয় দেখাতে এবং ব্ল্যাকমেইল করতে পারমাণবিক অস্ত্র খোঁজার দায়ে অভিযুক্ত করেন। তবে এ দাবি তেহরান বছরের পর বছর ধরে অস্বীকার করে আসছে এবং বলছে তাদের কর্মসূচি কেবল বেসামরিক উদ্দেশ্যে।
এদিকে সোমবার 'ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল' এক প্রতিবেদনে বলেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে মজুত করা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দের জন্য মার্কিন স্পেশাল ফোর্সের একটি অভিযানের কথা বিবেচনা করছেন। সামরিক বিশেষজ্ঞরা যুদ্ধের শুরু থেকেই সতর্ক করে আসছিলেন যে, শুধু মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলা ইরানের সক্ষমতা ধ্বংস করতে পারবে না।
হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট আলজাজিরাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে এই প্রতিবেদনটি অস্বীকার করেননি, বরং তিনি বলেছেন, ‘কমান্ডার-ইন-চিফকে (প্রেসিডেন্ট) সর্বোচ্চ বিকল্প ব্যবস্থা প্রদান করার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া পেন্টাগনের কাজ। তার মানে এই নয় যে প্রেসিডেন্ট কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’
মার্কো রুবিও বলেন, ‘ইরানকে অবশ্যই সন্ত্রাসবাদে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে হুমকি দেয় এমন অস্ত্র উৎপাদন বন্ধ করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ইরানের স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত এবং বাহরাইনে হামলা চালানো।’
হরমুজ প্রণালি ও যুদ্ধের লক্ষ্য
হরমুজ প্রণালি, যা ইরান কার্যত সাধারণ যাতায়াতের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে, সেটি নিয়ে রুবিও আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে সংঘাত শেষ হলে এটি খুলে দেওয়া হবে। রুবিও বলেন, ‘ইরানে আমাদের সামরিক অভিযান শেষ হলে হরমুজ প্রণালি যেকোনো উপায়ে পুনরায় উন্মুক্ত হবে। এটি হয় ইরানের সম্মতিতে অথবা যুক্তরাষ্ট্রসহ একটি আন্তর্জাতিক জোটের মাধ্যমে খোলা হবে।’ যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরেও যদি ইরান প্রণালিটি বন্ধ রাখে, তবে তিনি ‘ভয়াবহ পরিণতির’ হুমকি দেন।
সোমবার রুবিওর দেওয়া এই বক্তব্যগুলো মূলত যুদ্ধ শেষ করার জন্য ওয়াশিংটনের দেওয়া শর্তাবলীরই প্রতিফলন। তবে ইরান এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান পাল্টা দাবি তুলেছেন, যার মধ্যে রয়েছে ইরানের বৈধ অধিকারের স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং ভবিষ্যতে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা।
অন্যদিকে, ট্রাম্প 'ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি ইরানের তেল দখল করতে চান, যার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখলের সম্ভাবনাও রয়েছে। ট্রাম্প বলেন, ‘হয়তো আমরা খার্গ দ্বীপ দখল করব, হয়তো করব না। আমাদের হাতে অনেক বিকল্প আছে। এর অর্থ হবে আমাদের সেখানে কিছু সময়ের জন্য অবস্থান করতে হবে।’
ট্রাম্প প্রশাসন এই যুদ্ধে একাধিক লক্ষ্য উপস্থাপন করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ইরানের সামরিক সক্ষমতা হ্রাস করা, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি রোধ করা এবং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে সহায়তা করা। তবে যুদ্ধের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। ইসরায়েল যেখানে পূর্ণাঙ্গ শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য হয়তো ভিন্ন হতে পারে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ইরানে অন্তত ১ হাজার ৯৩৭ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়াও যুদ্ধে ইসরায়েলে ২০ জন, উপসাগরীয় দেশগুলোতে ২৬ জন এবং ১৩ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। রুবিও আলজাজিরাকে বলেন, মার্কিন প্রশাসন আশা করে না এই যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল ধরে চলবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘ইরানে আমাদের লক্ষ্য পরিষ্কার এবং আমরা তা মাসের মধ্যে নয়, সপ্তাহের মধ্যেই অর্জন করব।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক