দুই মাসের যুদ্ধে ইরান কতটা পরিবর্তন হয়েছে, আগে কেমন ছিল?
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রথম হামলার পর দুই মাস পার হয়েছে আজ। এই ৬০ দিনে ইরানের ৯০ মিলিয়নেরও বেশি মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন এলেও দেশটির শাসনকাঠামো ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার কিছু দিক আগের চেয়েও বেশি রক্ষণশীল হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ এখনো শেষ হয়নি, তবে বর্তমান পরিস্থিতি ইরানের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে। খবর আল জাজিরার।
নেতৃত্বের পরিবর্তন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে ‘শাসন পরিবর্তন’ হয়ে গেছে বলে দাবি করলেও বাস্তবতা কিছুটা ভিন্ন। সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর ধারাবাহিক হামলার পর দেশটির প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো কার্যকর রয়েছে। খামেনির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনিকে একটি ধর্মীয় পরিষদ দ্রুত উত্তরাধিকারী হিসেবে নির্বাচিত করেছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে প্রকাশ্যে দেখা না গেলেও সামরিক, রাজনৈতিক ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ তাঁর প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছে।
অন্যদিকে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) আগের মতোই শক্তিশালী রয়েছে। তারা সামরিক অভিযানের পাশাপাশি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে। নতুন জাতীয় নিরাপত্তা সচিব হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আইআরজিসির প্রবীণ নেতা মোহাম্মদ বাঘের যুলঘাদর, যিনি ওয়াশিংটনকে কোনো ছাড় দিতে নারাজ।
রাজনৈতিক সমীকরণ
ইরানি কর্তৃপক্ষ ট্রাম্পের দাবি করা ছাড়গুলো দিতে রাজি নয়, কারণ তারা মনে করে এটি আত্মসমর্পণের শামিল। প্রয়োজনে অবকাঠামো ধ্বংস হলেও তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যেতে প্রস্তুত।
মধ্যপন্থি হিসেবে পরিচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বর্তমানে কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সীমাবদ্ধ। সংস্কারপন্থি নেতা মোহাম্মদ খাতামি বা জাভেদ জারিফরা কট্টরপন্থিদের তোপের মুখে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। এদিকে, তেহরান লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনে তাদের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। এমনকি দেশের ভেতরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইরাকের ‘হাশদ আল-শাবি’ যোদ্ধাদের এনে রাস্তায় কুচকাওয়াজ করানো হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালি ও পারমাণবিক বিতর্ক
ইরানের বর্তমান কৌশলের মূল কেন্দ্রে রয়েছে পারমাণবিক কর্মসূচি ও হরমুজ প্রণালি। তেহরান স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা স্থগিত রাখবে ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠাবে না।
বর্তমানে আইআরজিসির প্রধান লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা ও মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়া। ইরান ও ওমান যৌথভাবে এই জলপথ পরিচালনার দাবি তুলছে। এমনকি জলপথ ব্যবহারের জন্য ‘মাশুল’ বা ট্যাক্স আরোপের আইন তৈরি করছে ইরান সরকার, যাতে যুদ্ধের ফলে হওয়া ২৭০ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি কিছুটা হলেও পুষিয়ে নেওয়া যায়।
বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ সংকট
টানা ৬০ দিন ধরে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় ইরানে লাখ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। বোমাবর্ষণে ইস্পাত ও পেট্রোকেমিক্যাল প্ল্যান্টগুলো ধ্বংস হওয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। মুদ্রাস্ফীতি আকাশচুম্বী হওয়ায় সাধারণ মানুষ চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়েছে। সরকার দুর্নীতির ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানিতে সস্তা মুদ্রা বরাদ্দের প্রথা পুনরায় চালু করতে বাধ্য হয়েছে।
কঠোর নিরাপত্তা ও দমন-পীড়ন
দেশের ভেতরে যেকোনো ধরনের ভিন্নমত দমনে বিচার বিভাগ কঠোর অবস্থান নিয়েছে। কথিত গুপ্তচরবৃত্তি বা স্টারলিঙ্ক ব্যবহারের অভিযোগে অনেকের সম্পদ বাজেয়াপ্ত ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে।
জানুয়ারির বিক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ নিহত হওয়ার পর তেহরানের রাস্তায় এখন ভারী সাঁজোয়া যান, মেশিনগান ও মুখোশধারী সেনাদের টহল এক সাধারণ দৃশ্যে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেখানে বহিঃশত্রুর হামলা ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ধস দেশটির ভবিষ্যৎ অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক