ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি চুক্তির বিষয়ে সমঝোতায় বিশ্বজুড়ে স্বস্তির বার্তা
সব ফ্রন্টে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসান এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে একটি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। মাসের পর মাস ধরে চলা প্রাণঘাতী সহিংসতা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলার পর আজ সোমবারের (১৫ জুন) এই ঘোষণা বিশ্বজুড়ে স্বস্তি বয়ে এনেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান জানিয়েছে, আগামী শুক্রবার (১৯ জুন) সুইজারল্যান্ডে এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হতে যাচ্ছে। সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে এবং সাধারণ ইরানিরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, এর মাধ্যমে শান্তি ফিরে আসতে পারে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
চুক্তির খুব কম বিবরণই জনসমক্ষে আনা হয়েছে, তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, যুদ্ধের শুরু থেকে ইরান যে বিশ্ব তেলের সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে রেখেছিল, তা খুলে দেওয়া হবে।
গতকাল রোববার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সঙ্গে চুক্তিটি এখন সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্বের জাহাজগুলো, আপনাদের ইঞ্জিন চালু করুন। তেল সরবরাহ হতে দিন!’
এর পরপরই ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি টেলিভিশনে দেওয়া বক্তব্যে বলেন, এই চুক্তি যুদ্ধের অবসান ঘটিয়েছে এবং একটি ‘চূড়ান্ত চুক্তি’র লক্ষ্যে তারা দুই মাসের মধ্যে আলোচনায় বসবেন।
ইরানের সামরিক বাহিনী এই চুক্তিকে একটি বিজয় হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে। তাদের দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাপক বিমান হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধে তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ‘হতাশ ও অপমানিত’ করেছে।
তবে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বলেছেন, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার ঘোষণা সত্ত্বেও ইসরায়েলি বাহিনী লেবানন, সিরিয়া এবং গাজায় অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করবে।
ইসরায়েল কাটজ সোমবার বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং আমি একটি স্পষ্ট নীতি অনুসরণ করছি এবং এর অধীনে সীমান্ত থেকে আমাদের জনপদগুলোকে জিহাদি উপাদান থেকে রক্ষা করতে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী লেবানন, সিরিয়া এবং গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থান করবে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সরকারি সূত্র এএফপি-কে জানিয়েছেন, লেবানন কর্তৃপক্ষকে এই চুক্তির বিশদ বিবরণ সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি।
শর্তগুলো অস্পষ্ট
কয়েক সপ্তাহের টানটান উত্তেজনাপূর্ণ আলোচনা এবং নতুন করে শত্রুতার মাঝেই আসা হুমকির পর এই চুক্তিটি হলো, তবে এর বিশদ বিবরণ এখনো অস্পষ্ট।
ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, আলোচনা শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ১২ বিলিয়ন ডলারের অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্ত করে দেবে।
সংস্থাটি দুই দেশের মধ্যে একটি ১৪-দফা ‘পারস্পরিক সমঝোতা স্মারক’ -এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছে, স্মারক স্বাক্ষরের পর শুরু হওয়া ৬০ দিনের আলোচনা চলাকালীন সময়ে আরও ২৪ বিলিয়ন ডলারের অবরুদ্ধ ইরানি সম্পদ মুক্ত করার শর্ত এতে রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য এই বিবরণের ওপর তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। তেহরানের পারমাণবিক আকাঙ্ক্ষা বন্ধ করতে এবং তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ সরিয়ে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টার কারণে এই বিষয়টি বেশ বিতর্কিত হতে পারে। ওই ইউরেনিয়াম গত বছরের মার্কিন হামলায় ভূগর্ভস্থ অবস্থায় ইরানে রয়ে গেছে বলে মনে করা হয়
গতকাল রোববার নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ইরান ২০ বছরের জন্য তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখবে কি না, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনও আলোচনা করছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন যে, তিনি ১৫ বছরের স্থগিতাদেশেও রাজি হতে পারেন, তবে এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা করতে চান না।
একজন কূটনীতিক সোমবার এএফপি-কে জানিয়েছেন, চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের আগে দোহায় পরোক্ষ বৈঠকে বসবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান।
সুযোগ কাজে লাগানো
এই চুক্তির ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্য এবং এর বাইরেও স্বস্তি বয়ে এনেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস একে যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেছেন।
এ প্রসঙ্গে তেহরানের ২৯ বছর বয়সী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার নাস্তারান বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হলে এবং আমাদের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়া হলে, আমি মনে করি এটি খুব ভালো হবে এবং আমি খুশি হব।’
যুদ্ধের সময় ইরানের বারবার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া সৌদি আরব এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা যোগ করেছে যে, একটি স্থায়ী চুক্তি সেটাই হবে যা আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা স্বার্থকে বিবেচনায় নেবে।
মিশর বলেছে, এই চুক্তি ‘মোড় পরিবর্তনকারী’ হতে পারে, অন্যদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ একে ‘শান্তির অভিমুখে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইতালি জানিয়েছে, তারা ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে প্রস্তুত এবং এই মুহূর্তটিকে কাজে লাগাতে, গতি বজায় রাখতে এবং একটি দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক সমঝোতা অর্জন করতে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করবে।
এই ঘোষণা আজ সোমবার বাজার খোলার সাথে সাথেই স্বস্তি নিয়ে আসে। তেলের দাম প্রায় পাঁচ শতাংশ কমে গেছে এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম মার্চের শুরুর পর প্রথমবারের মতো ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলারের কাছাকাছি নেমে এসেছে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে বলেছেন, ‘আমরা যা করতে যাচ্ছি তা হলো শুধু এখনই নয়, দীর্ঘমেয়াদেও জ্বালানি খরচ কমিয়ে আনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সমৃদ্ধির একটি প্রকৃত ইঞ্জিন তৈরি করা।’
জেডি ভ্যান্স জানান যে, জেনেভায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থাকার পরিকল্পনা করছেন এবং ট্রাম্প নিজেও সেখানে যেতে পারেন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক