দোহায় পরোক্ষ আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান
দুপক্ষের মধ্যে সংঘাতের পর উত্তেজনা প্রশমন এবং আলোচনাকে আরও এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে আজ বুধবার (১ জুলাই) কাতারের রাজধানী দোহায় মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে পরোক্ষ আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র।
দুপক্ষই জানিয়েছে যে, তারা মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক নিয়ে আলোচনার জন্য কর্মকর্তা পাঠাবে; তবে ইরান জোর দিয়ে বলেছে কোনো সরাসরি আলোচনা হবে না। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
আলোচনা সম্পর্কে জানে এমন একজন কূটনীতিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, শত্রুতায় লিপ্ত থাকা এই দুই পক্ষ বুধবার দোহায় কাতারি ও পাকিস্তানি মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে পরোক্ষ ‘টেকনিক্যাল’ আলোচনায় অংশ নেবে।
ওই কূটনীতিক আরও বলেন, এই আলোচনাগুলো অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এখানে সমঝোতা স্মারকের খুঁটিনাটি বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হচ্ছে, যা মূলত লেক লুসার্ন শীর্ষ সম্মেলনে অর্জিত অগ্রগতিকে আরও বেগবান করবে।
কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় তৈরি এই সমঝোতা স্মারকটি গত মাসে সুইজারল্যান্ডের লুসার্নে অনুষ্ঠিত একটি শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ পেয়েছিল।
এর মধ্যে রয়েছে ৬০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি, যা গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধকে সাময়িকভাবে থামিয়ে রাখবে। সেই সঙ্গে অবরুদ্ধ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং স্থায়ীভাবে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর সময়সীমাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি বলেছেন, ইরানি প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে থাকবেন উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরানি কর্মকর্তাদের আগামী দিনগুলোতে কোনো স্তরেই মার্কিন পক্ষের সাথে আলোচনার কোনো পরিকল্পনা নেই।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কূটনীতিক এএফপি-কে আরও জানিয়েছেন, মার্কিন দূত জ্যারেড কুশনার এবং স্টিভ উইটকফ এই টেকনিক্যাল আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন না; তারা মঙ্গলবার কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুলরহমান আল থানির সাথে বৈঠক করেছেন।
এক বিবৃতিতে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা তিনজনই সমঝোতা স্মারকের কাঠামোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে চলমান আলোচনা এবং লেবাননের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন।
১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে পারস্য উপসাগরে দুই পক্ষই পাল্টাপাল্টি গোলাবর্ষণ করেছে। তেহরান একটি বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এর জবাবে জানায়, তারা সপ্তাহান্তে ইরানের ১০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এরপর ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে এর জবাব দেয়।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মঙ্গলবার একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, যখন এই মাত্রার একটি যুদ্ধ শেষ পর্যায়ে আসে... তখন বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ, অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এবং মতবিরোধ থাকা অনিবার্য, বিশেষ করে যেখানে ইসরায়েলি শাসনের মতো পক্ষগুলো জড়িত থাকে।
আপেক্ষিক শান্ত পরিস্থিতি
বাঘের গালিবাফ বলেন, দোহায় ইরানি প্রতিনিধি দল মূলত হরমুজ প্রণালি এবং লেবাননের যুদ্ধ সংক্রান্ত চুক্তির ধারাগুলো বাস্তবায়নের ওপর জোর দেবে। তিনি আরও বলেন, স্বাভাবিকভাবেই ইরান এই চুক্তি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এবং শত্রু পক্ষ অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রকেও তাদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে।
কাতারে এই আলোচনার আগের দিনগুলোতে পাল্টাপাল্টি হামলা কিছুটা শান্ত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। লেবানন সীমান্তে ইসরায়েল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যকার লড়াইও আপেক্ষিক শান্ত রয়েছে।
তেহরান জোর দিয়ে বলেছে, যেকোনো চুক্তিতে লেবাননের সমান্তরাল যুদ্ধ বন্ধ করা এবং দক্ষিণ লেবানন থেকে (যার কিছু অংশ তারা দখল করে রেখেছে) ইসরায়েলি সৈন্য প্রত্যাহার অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
গালিবাফ আরও জানান, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে মার্কিন অবরোধ তুলে নেওয়ার পর থেকে দেশটির তেল রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে; হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌচলাচল ইরান বন্ধ করে দেওয়ার পর ওয়াশিংটন এই অবরোধ আরোপ করেছিল।
বাঘের গালিবাফ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, ‘যেদিন অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়েছে সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত আমরা ৪০ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি তেল রপ্তানি করেছি। এর বিপরীতে, আগের ৫০ থেকে প্রায় ৬০ দিন আমরা প্রকৃতপক্ষে এক ব্যারেল তেলও রপ্তানি করতে পারিনি।’

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক