বইমেলায় জুলাইয়ের অপ্রকাশিত গল্প নিয়ে ‘মরদেহ গণনার কয়েকটি দিন’
উত্তাল ও রক্তাক্ত জুলাইয়ের দিনগুলোকে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতায় ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন সাংবাদিক ও লেখক মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ। তার নতুন গ্রন্থ ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান : মরদেহ গণনার কয়েকটি দিন’-এ উঠে এসেছে সেই সময়ের অপ্রকাশিত মানবিক গল্প। যা সংবাদমাধ্যমের সীমিত পরিসরে পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
বইটি প্রকাশিত হচ্ছে অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এ। প্রকাশনা সংস্থা ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিত বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। মেলায় ৫৮১ থেকে ৫৮৬ নম্বর স্টলে বইটি পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে প্রকাশনা কর্তৃপক্ষ। প্রচ্ছদ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৭০ টাকা (৮ মার্কিন ডলার)।
বইয়ের ফ্লপে লেখা
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। এ ঘটনার আগে ও পরে ঘটেছে বহু কিছু; রয়েছে মতাদর্শ, তত্ত্ব এবং বিশ্লেষণ। তবে এই বইয়ে সেই কঠিন আলোচনা নেই। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: মরদেহ গণনার কয়েকটি দিন’ মূলত একজন সাংবাদিকের মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়ানো দিনগুলোর নিরাভরণ বিবরণ। লেখক এ বইয়ে সেই ঘটনাবহুল সময়ের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লিখেছেন, যা তিনি সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন। রাজপথ থেকে হাসপাতালের ওয়ার্ড, জরুরি বিভাগ থেকে মর্গ—প্রতিটি জায়গার অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা, হতাহতদের খোঁজে ছুটে চলা স্বজনহারাদের কান্না এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিক্রিয়া—সবকিছুরই এক জীবন্ত দলিল এ গ্রন্থ।
এটি কোনো দূরবর্তী বিশ্লেষণ নয়; বরং একজন সাংবাদিকের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনার জবানবন্দি। পাঠককে কখনও মর্মাহত করবে, কখনও ভাবিয়ে তুলবে।
বইয়ের ব্যাক ফ্লপে লেখকের পরিচিতি
মুহাম্মাদ শফিউল্লাহ পেশায় সাংবাদিক, লেখক ও গবেষক। আট বছর ধরে জাতীয় পর্যায়ে সাংবাদিকতা করছেন। বর্তমানে তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক আজকের পত্রিকা-এর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক। এর আগে দৈনিক বণিক বার্তা এবং একুশে টেলিভিশন-এ কাজ করেছেন। পাঁচ বছর ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় যুক্ত থেকে দৈনিক ইত্তেফাক, দ্য ডেইলি নিউএজ ও এনটিভি অনলাইন-এ কাজ করেন।
তিনি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নৃবিজ্ঞানে বিএসএস ও এমএসএস এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটির সদস্য ছিলেন এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের একজন প্রশিক্ষিত ক্যাডেট।
এই তরুণ লেখকের জন্ম ১৯৯৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর, বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল বিজয় দিবসে। সাত ভাইয়ের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। পিতৃপুরুষের নিবাস বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ হলেও তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা পিরোজপুরে। কালীগঙ্গা, সন্ধ্যা, কঁচা ও বলেশ্বর নদীর স্নেহের মায়ায় কেটেছে তার শৈশব ও কৈশোর। মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন পিরোজপুর টাউন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এবং উচ্চমাধ্যমিক পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজ থেকে।
কৈশোরকাল থেকেই তার লেখকসত্তা গড়ে ওঠে। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: মরদেহ গণনার কয়েকটি দিন’ তার দ্বিতীয় গ্রন্থ। ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গ্রন্থ ‘আসমত আলীর অনশন’, যা তার লেখা ছোটগল্পের গ্রন্থ।
বইয়ের ভূমিকায় লেখা আছে
পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের নানা ঘটনার সাক্ষী হতে হয়। সব ঘটনাই গভীরভাবে পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণ করতে হয়। সংবাদে যতটুকু উপস্থাপন করা যায়, তার বাইরেও বহু ঘটনা থেকে যায়। অনেক সময় সেসব উপস্থাপন করা হয় না বা যায় না। অধিকাংশ সাংবাদিক প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরতে সচেষ্ট থাকেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান আমাদের জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এমন ইতিহাস সহসা রচিত হয় না। একজন সাংবাদিক হিসেবে জানার চেষ্টা করেছি এবং পাঠকদের জানাতে চেষ্টা করেছি কী হয়েছিল ওই দিনগুলোতে।
‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান: মরদেহ গণনার কয়েকটি দিন’ বইয়ে তত্ত্ব, বিশ্লেষণ, ইতিহাস বা দর্শনের কোনো কাঠামো নেই। আমি অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে মাঠে কাজ করার সময় যা দেখেছি, তার বর্ণনা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। চোখের সামনে সংঘটিত ঘটনা লিখেছি। অভ্যুত্থানের সময় সারাদেশের সব ঘটনা তুলে ধরা হয়নি। সাংবাদিক হিসেবে প্রতিদিন সম্মুখীন হওয়া ঘটনাগুলোর বর্ণনা দিয়েছি—কীভাবে কাজ করেছি, কী দেখেছি ইত্যাদি। এসব লিখতে গিয়ে অন্য কয়েকটি ঘটনার কিছু অংশ লেখায় এসেছে মাত্র। আমি যেসব ঘটনার সাক্ষী বা প্রত্যক্ষদর্শী নই, সেগুলোর উল্লেখ তথ্যসূত্র দিয়ে করা হয়েছে। কাজ করতে গিয়ে কী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে, তা তুলে ধরেছি। এমন পরিস্থিতি আমার পেশাগত জীবনে হয়তো আর আসবে না; আমি চাইও না এমন রক্তাক্ত ইতিহাস বাংলাদেশে আর কখনো রচিত হোক।
বইটিতে শুধু গণঅভ্যুত্থানের সময়ে মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা, সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে। কেউ একে ওই দিনগুলোতে একজন সাংবাদিকের ডায়েরি বললেও ভুল হবে না। গণঅভ্যুত্থানের আগে বা পরে বহু ঘটনা থাকলেও সেগুলো এই বইয়ে নেই। এখানে গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোর কথাই বলা হয়েছে। আর সব দিনের ঘটনা লিপিবদ্ধ করা হয়নি, কেননা আমি যে দিনগুলোতে মাঠে থেকেছি, শুধু সেই দিনগুলোর ঘটনা তুলে ধরাকেই কর্তব্য মনে করেছি।
এই বই লেখার জন্য নিজের মধ্যে কিছুটা তাগিদ অনুভব করেছিলাম। এতে আলোর মুখ দেখাতে সহায়তা করেছেন প্রিয় কিছু মানুষ। তাঁরাই প্রতিদিন আমাকে লেখার তাগিদ দিয়েছেন, একটু একটু করে লেখার শক্তি জুগিয়েছেন। তাঁদের প্রতি আমার অসীম ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। বিশেষ কৃতজ্ঞতা মো. মুসা মিয়া ও আফসারুল ইসলাম ভাইয়ের প্রতি; বইটি সম্পাদনায় তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ সময় ব্যয় করেছেন।
কারও প্রতি রাগ বা অনুরাগের কারণে কমবেশি কিছুই লিখিনি। যা দেখেছি, শুধু তা-ই লিখেছি। কিছু সম্পর্কযুক্ত বিষয়ের অবতারণা করলেও তা তথ্যের উৎস ব্যতীত উল্লেখ করা হয়নি। বইটি নির্ভুলভাবে লেখার চেষ্টা করেছি। এরপরও যেকোনো ভুলের জন্য দায় স্বীকার করে নিচ্ছি এবং পরবর্তী সংস্করণে সেগুলো সংশোধনের চেষ্টা করব।

ফিচার ডেস্ক