সুরের ইন্দ্রজাল
এক চিরযৌবনা কণ্ঠের মহাপ্রয়াণ
সংগীতের কোনো দেশ নেই, সীমানা নেই। কিন্তু সেই সংগীতে যখন আশা ভোঁসলের নাম উচ্চারিত হয়, তখন তা কেবল একটি নাম থাকে না, হয়ে ওঠে আট দশকের একটি ইতিহাস। আজ রোববার (১২ এপ্রিল) মুম্বাইয়ের আকাশে যখন শোকের ছায়া, তখন কোটি কোটি মানুষের কানে বাজছে সেই চঞ্চল, মাদকতাময় আর আবেগপ্রবণ কণ্ঠস্বর। ৯৩ বছর বয়সে স্তব্ধ হলো সেই সুর, যা আট দশক ধরে ভারতীয় উপমহাদেশকে স্পন্দিত করে রেখেছিল।
আশা ভোঁসলের পথ চলাটা মোটেও সহজ ছিল না। বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের মতো আকাশসম ব্যক্তিত্বের ছায়ায় নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়া ছিল এক দুঃসাধ্য চ্যালেঞ্জ। ১৯৪৩ সালে ‘মাঝলি হ্যায়’ সিনেমার মাধ্যমে শুরু হওয়া সেই সফর শুরুতে ছিল অনেকটা জীবনযুদ্ধের মতো। ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন আর পেশাদারী প্রতিযোগিতার মাঝেও তিনি হার মানেননি। লতা যখন ধ্রুপদী আর গম্ভীর গানে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করছিলেন, আশা তখন বেছে নিলেন বৈচিত্র্য। ও পি নায়ার, খৈয়াম কিংবা এস ডি বর্মণের সুরে তিনি প্রমাণ করলেন তিনি কেবল গাইতে পারেন না, তিনি গানের আত্মাকে ধারণ করতে পারেন।
আশা ভোঁসলে এবং আর ডি বর্মণ (পঞ্চম) এই জুটি ভারতীয় চলচ্চিত্রের সংগীতকে আমূল বদলে দিয়েছিল। পাশ্চাত্য পপ, জ্যাজ আর ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের যে মেলবন্ধন তারা তৈরি করেছিলেন, তা আজও আধুনিক। ‘চুরা লিয়া হ্যায় তুমনে জো দিল কো’ বা ‘দম মারো দম’-এর মতো গানগুলো কেবল জনপ্রিয়তা পায়নি, বরং আধুনিক সংগীতের ব্যাকরণ তৈরি করেছে। ব্যক্তিগত জীবনেও আর ডি বর্মণ ছিলেন তার পরম আশ্রয়। সম্প্রতি এক পডকাস্টে তিনি স্মৃতিচারণ করেছিলেন, কীভাবে বর্মণ সাহেব তাকে ভালোবেসে ‘বাবুয়া’ বলে ডাকতেন। সেই সোনালি দিনগুলো আজ কেবলি স্মৃতি।
আশা ভোঁসলে সবসময় বিশ্বাস করতেন, স্টুডিওর চেয়ে মঞ্চেই শিল্পীর আসল পরীক্ষা। তিনি বলতেন, মঞ্চে দাঁড়ালে পুরোনো স্মৃতিগুলো ভেসে আসে, কণ্ঠস্বর কেঁপে ওঠে আবেগে। তার জীবনের শেষ ইচ্ছা ছিল অত্যন্ত অনুপ্রেরণামূলক তিনি গাইতে গাইতেই মরতে চেয়েছিলেন। ৮২ বছর ধরে প্লেব্যাক করার পর ৯৩ বছর বয়সেও তার সেই ইচ্ছাশক্তি আমাদের শেখায় শিল্পের প্রতি সমর্পণ কাকে বলে।
আশার কণ্ঠের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার ‘ভার্সেটাইল’ বা বহুমুখী হওয়ার ক্ষমতা। একদিকে তিনি যেমন ‘পিয়া তু আব তো আজা’-র মতো ক্যাবারে গান গেয়ে মাতিয়েছেন, অন্যদিকে ‘উমরাও জান’ সিনেমায় তার গজল (যেমন: ‘ইন আঁখো কি মাস্তি কে’) আজও শ্রোতাদের চোখে জল আনে। গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস অনুযায়ী বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গান রেকর্ড করা এই শিল্পী কেবল হিন্দি নয়, বাংলাসহ ২০টিরও বেশি ভাষায় গান গেয়েছেন। আমাদের বাংলা আধুনিক গান আর সিনেমার গানেও তার অবদান অবিস্মরণীয়।
আশা ভোঁসলে নেই, এটা মানা কঠিন। কারণ রেডিওর টিউনিংয়ে বা স্মার্টফোনের প্লেলিস্টে এখনো তিনি বেঁচে আছেন প্রতি মুহূর্তে। তিনি চলে গিয়েও রেখে গেছেন এক বিশাল শূন্যতা, যা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। ৯৩ বছরের এক বর্ণাঢ্য জীবনের অবসান হলো ঠিকই, কিন্তু যে সুরের ইন্দ্রজাল তিনি বুনে গেছেন, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নবীন শিল্পীদের পথ দেখাবে।

ফিচার ডেস্ক