‘গান গাইতে গাইতেই যেন মারা যাই’
ভারতীয় সংগীতজগতের নক্ষত্রপুঞ্জের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র এবং ‘দিল তো পাগল হ্যায়, ‘এক পরদেশী মেরা দিল লে গয়া’, ‘তুমসে মিলকে’র মত বহু জনপ্রিয় হিন্দি গানের শিল্পী আশা ভোঁসলে চিরবিদায় নিয়েছেন। আজ রোববার (১২ এপ্রিল) মুম্বাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। প্রয়াত কিংবদন্তি শিল্পী লতা মঙ্গেশকরের ছোট বোন আশা ভোঁসলে হৃদরোগজনিত জটিলতা ও ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছিলেন। সুরের এই মহীরুহের প্রয়াণে সংগীতের একটি স্বর্ণযুগের অবসান হলো।
আট দশকেরও বেশি সময় ধরে কয়েক হাজার কালজয়ী গানে শ্রোতাদের মোহিত করে রাখা এই শিল্পী তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী গানের মাঝেই বিদায় নিতে চেয়েছিলেন।
সম্প্রতি ‘কাপল অফ থিংস উইথ আরজে আনমোল এবং অমৃতা রাও’-এর একটি পডকাস্টে এসে নিজের শেষ ইচ্ছের কথা জানিয়েছিলেন এই কিংবদন্তি। তিনি বলেছিলেন, একজন মায়ের ইচ্ছা যেমন তার সন্তানরা ভালো থাকুক, আমার ইচ্ছা আমি যেন গান গাইতে গাইতেই মারা যাই। আমি গান ছাড়া বাঁচি না।
৮২ বছর ধরে প্লেব্যাক করা এই শিল্পী ৩ বছর বয়স থেকে শাস্ত্রীয় সংগীতের পাঠ শুরু করেছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুরই ছিল তার ধ্যানজ্ঞান।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আশা জানিয়েছিলেন— তার স্বামী, কিংবদন্তি সুরকার আর ডি বর্মণের (পঞ্চম) বিনয়ী স্বভাবের কথা। তিনি জানান, অর্থ বা গয়না নয়, বরং নতুন গান সৃষ্টি করাই ছিল বর্মণের আসল আনন্দ। ব্যক্তিগত জীবনে আর ডি বর্মণ তাকে ভালোবেসে ‘বাবুয়া’ বা ‘বাব’ বলে ডাকতেন। যদিও জনসমক্ষে তিনি সবসময় ‘আশা’ নামেই তাকে সম্বোধন করতেন।
মঞ্চে গান গাওয়ার অভিজ্ঞতা নিয়ে আশা বলেছিলেন, স্টুডিওর চেয়ে মঞ্চের পরিবেশ অনেক বেশি আবেগের। তার ভাষায়, মঞ্চে আবেগ পুরো বিষয়টা দখল করে রাখে। গলা আটকে যায়, কণ্ঠস্বর কাঁপে। পুরোনো স্মৃতিগুলো সেই রাত, সেই চিঠি, বালিশের পাশে রাখা গোলাপগুলো ভেসে ওঠে। শ্রোতারাও তখন তাদের নিজস্ব অতীতকে পুনরুজ্জীবিত করে আমার গানের সাথে সংযোগ স্থাপন করে।
ভারতীয় সংগীতের অন্যতম আইকনিক ও বহুমুখী প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে সুপরিচিত আশা ভোঁসলে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি হিন্দি, বাংলাসহ একাধিক ভারতীয় ভাষার পাশাপাশি বিভিন্ন বিদেশি ভাষায়ও হাজার হাজার গান রেকর্ড করেছেন। শাস্ত্রীয়, লোকসংগীত, পপ থেকে গজল—বিভিন্ন ধারার সংগীতে অসাধারণ মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা তাকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তার গাওয়া অসংখ্য গান আজও সমান জনপ্রিয়। সময়ের সীমানা পেরিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করে চলেছে।
ভারতীয় সংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আশা ভোঁসলে অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন। তিনি ভারতের সর্বোচ্চ চলচ্চিত্র সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’-এ ভূষিত হয়েছেন এবং ‘পদ্মবিভূষণ’ও অর্জন করেছেন। পাশাপাশি তিনি একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার জিতেছেন, যা তাকে ভারতীয় প্লেব্যাক সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ও সর্বাধিক সম্মানিত কণ্ঠশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক