প্রেম ও আধ্যাত্মিক দ্বন্দ্বের কাব্য ‘আস্তিক-নাস্তিকের মধ্যবর্তী হাইফেন’
উঠোনে জলধ্বনি বেজে উঠেছে। বিশ্বাসী হৃদয় অবিশ্বাসের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতায় এখন ক্ষুধার্ত হাঙর। অনন্তকালের মন্বন্তর শেষে অঞ্জলি ভরা অমৃত অম্লজলে তৃপ্ত কবির বিশ্বাস আরও সুদৃঢ় হয়ে ওঠে—‘আমি ক্ষুধার্ত হাঙর, অন্তর চৌচির ছিলো/কামের তৃষ্ণায়, সে হাত ভরে কাম ঢালল/কণ্ঠনালীতে।’
কবি মাহবুবা করিমের কাব্যভাষা প্রাঞ্জল, উপমা প্রয়োগের দক্ষতা মোহনীয়, রূপক-প্রতীকে অনন্য। তাঁর ভাবনার বীজতলায় তৈরি কাব্যালঙ্কারে কাম ও কৌমাচার একাকার হয়ে যায়—
‘যে একবার নদীর শোভা গিলেছে, ঝরনার
পাদদেশে জলের ফেণা শরীরে মেখেছে, তনুর
খাঁজে রেখেছে সাতান্ন পদ্ম, যে হেঁটেছে পাহাড়
ডিঙিয়ে গঙ্গার তীর শেষ পথ ও আয়ুর রেখা
জুড়ে।’
মাহবুবা করিমের কাব্যশৈলী যে কোনো পাঠককে মোহাবিষ্ট করবে। রাতের পাপড়ি উন্মোচনের জটিল রহস্যময় বিষয়কে খুব সহজে উপস্থাপন করতে পারাটাই যেন তাঁর শিল্পদক্ষতার অনন্য নজির—
‘তোমাকে আরও অধিক শিথিল হতে বললে,
আমি তোমাকে রাতের পাপড়ি উন্মোচন-
স্বচক্ষে দর্শনের আহ্বান করব।’
নাথপ্রেমময় এই কাব্যগ্রন্থ কাম-আবেদনপূর্ণ। কামকে শৈল্পিক প্রলেপ দেওয়ায় মাহবুবা করিম সিদ্ধহস্ত। নাথজিহ্বার কারুকাজকে দারুণ ব্যঞ্জনায় ফুটিয়ে তুলেছেন কবি—
‘ধরা যেতে পারে তার জিহ্বার অগ্রভাগে অমৃত
রাখা ছিলো; নিঃশেষিত একটি বিন্দুও শুষে
নিলাম।’
যাবতীয় নেশাকে সুরায় উপমায়িত করার প্রাচীন রীতি কাব্যসাহিত্যে সর্বজনবিদিত। প্রাচীন থেকে মধ্যযুগ, মধ্যযুগ থেকে আধুনিক বা উত্তরাধুনিকেও সুরা কাব্যসাহিত্যের অনিবার্য নেশা-উপমেয়। কবি ব্ল্যাক লেবেলের গোলগাল বোতলজাতীয় পাত্র থেকে পান করা অমৃতে নেশায় বুঁদ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রকাশ করেছেন দারুণ শৈল্পিক ভাষায়—
‘আমাকে দিকজ্ঞানহীন করেছিল ব্ল্যাক লেবলের
বোতল থেকে পান করা অমৃত।’
এভাবে পুরুষই প্রতি রাতে মদ হয়ে ওঠে নারীর কামনায়—
‘তোমার সৃজনশীল আঙুল থেকে উঠে আসে
আমার বন্যতা, তুমি তো মদ প্রতিরাতে পান
করে আসমানে উড়ি।’
এমন অমৃতপানে অনন্তকালের পিপাসাকাতর কবি নাথস্পর্শের অগ্র-পশ্চাৎ উপস্থাপন করে লেখেন—
‘উফ্ কেমন তোমার আঙুল থেকে চিত্রায়িত
দেহের তৈলচিত্র, কেমন তুমি তাবু খাঁটিয়ে
কুশিকাঁটার মতন এফোঁড়-ওফোঁড় করে গতরে
বহির্ভাগে তৈরী করেছ নেশায় টলমল আরেক
শরীর, শরীরে শরীরে গ্রহণ লাগিয়েছো,
শরীরকে গিলে নিয়েছে শরীর। সেইসব মাঝারি
যুদ্ধে হেরে যাওয়া নেই, ফুরিয়ে যাওয়া নেই,
প্রতি স্পর্শে স্পর্শে দুলে ওঠে ফসলি মাঠ।’
অতপর—
‘পঁচাত্তর হাজার প্রজাপতির বাচ্চা উড়ে গিয়ে
বসেছে পার্কের প্রতিটি বেঞ্চে।’
কী চমৎকার দৃশ্যায়ন! পাঁচ-সাতের মারপ্যাঁচে মাহবুবা করিম পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেন এক রোমান্টিক চিন্তাসূত্রের সন্ধিক্ষণে। নাথ আসে না, নাথ আসে। নাথ আসে, নাথ হারায়। সুখ-দুঃখের আসা-যাওয়ায় যাপিত জীবনের নির্মম বাস্তবতায় কবি পড়ে যান বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সীমাহীন দ্বন্দ্বে। এমন পরিস্থিতিতে নাথের প্রস্থানকে কবি এঁকেছেন গণমানুষের ভাষায়—
‘তবুও নারী ও নদীর কাছে এসে মুখ ডুবিয়ে, সে
আমাকে ফেলে গেল মুয়াজ্জিনের প্রতিটি ডাক
অগ্রাহ্য করা নাস্তিকের মতোই।’
নাস্তিক-আস্তিকের মধ্যবর্তী হাইফেনে দাঁড়িয়ে মাহবুবা করিম নাথকে পেয়ে বিশ্বাসী হয়ে উঠতে চান। প্রভুর দয়ার ভিখারি হয়ে বিশ্বাসী হয়ে ওঠার মন্ত্রপাঠ করে লেখেন—
‘নাস্তিক হয়েছি তো তারই দোষে;/কিঞ্চিত
পেলেও গুনগান করা যায়;/তিনি যে দয়ালু
স্বীকার করা যায়;/যেত, তোমাকে পেলে।’
যাপিত জীবনের নির্মম বাস্তবতায় পরের জন্য যা কিছু হারাম, নিজের জন্য তা কিছু আরাম। এমন দ্বিচারিতায় প্রভুর প্রতি আক্ষেপ প্রকাশ করে লেখেন— ‘আমার শরীরকে হারাম করে তুলেছ প্রেমের জন্য। যেমন ইতিপূর্বে প্রেমিক আমার এই শরীরকে হারাম করেছিল সমস্ত পুরুষের জন্য এবং নিজেকে হালাল করেছিল আমার শত্রুদের কামনায়।’
নাথময় প্রেমকাব্য ‘আস্তিক-নাস্তিকের মধ্যবর্তী হাইফেন’ নিঃসন্দেহে বাংলা কাব্যসাহিত্যে একটি অমূল্য সংযোজন। যেখানে নাথকেন্দ্রিক বিশ্বাস-অবিশ্বাসের আধ্যাত্মিক খেলায় দারুণ শব্দবাজিতে শিল্পসফল হয়ে উঠেছে মাহবুবা করিমের গদ্যকাব্যটি। পুরো কাব্যগ্রন্থটির আদ্যোপান্ত জুড়ে ‘আস্তিক-নাস্তিকের মধ্যবর্তী হাইফেন’টি চিরপ্রাসঙ্গিক হয়েই রয়ে গেছে শেষ পর্যন্ত।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক