গ্লুকোমার রোগী কেন বুঝতে পারেন না চোখের ক্ষতি হচ্ছে?
গ্লুকোমা চোখের একটি জটিল সমস্যা। এনটিভির নিয়মিত আয়োজন স্বাস্থ্য প্রতিদিন অনুষ্ঠানের ২৪৩৫তম পর্বে এ বিষয়ে কথা বলেছেন অধ্যাপক ডা. এম নজরুল ইলসাম। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ আই হাসপাতালে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
প্রশ্ন : গ্লুকোমা বলতে আমরা কী বুঝি।
উত্তর : গ্লুকোমা চোখের একটি রোগ। এই রোগে সাধারণত মানুষ ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যায়। কোনো লক্ষণ নেই, মানুষ কিছু বুঝতে পারছে না, একদিন দেখলেন উনি অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন। এই রোগটি হলো গ্লুকোমা। আমরা বলি, ‘সাইলেন্ট কিলার অব ভিশন’। এই জিনিসটি আসলে কি? জিনিসটা হলো, চোখের একটা চাপ থাকে, আপনি জানেন রক্তে যেমন চাপ থাকে, তেমনি চোখের একটা চাপ থাকে। আই প্রেসার বা ইন্ট্রাওকুলার প্রেসার। আপনি জানেন যে চোখের স্নায়ু দিয়ে আমরা দেখি। চোখ তো আসলে ক্যামেরা। ক্যামেরার মাধ্যমে আমরা দেখছি, এই ইমপালসটা স্নায়ু দিয়ে মস্তিষ্কে চলে যাচ্ছে। এই স্নায়ুর নাম হলো অপটিক নার্ভ। এই অপটিক নার্ভটি আস্তে আস্তে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে গ্লুকোমায়। চোখের চাপ বেশি হয়ে গেলে। একদিনেই যে অন্ধ হয় সেটি কিন্তু নয়, আস্তে আস্তে পাঁচ-দশ বছর ধরে এই সমস্যাটি হয়। এভাবে যদি কারো চোখের চাপ বেড়ে অপটিক নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার কারণে আমাদের যে পাশের দৃষ্টির পরিসীমা এটা কমে যায়। কমতে কমতে একসময় সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যায়। এই যে রোগটি, এর নাম হলো গ্লুকোমা।
প্রশ্ন : এই রোগের লক্ষণ কি একেবারেই প্রকাশ পাবে না? রোগী কীভাবে বুঝবে?
উত্তর : আসলে ৮০ ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় এর কোনো লক্ষণ নেই। মানুষ বুঝতে পারে না। তবে গ্লুকোমার অনেক প্রকার রয়েছে। অনেক ধরন রয়েছে। যেমন ধরুন ওপেন এঙ্গেল গ্লুকোমা। একটু বিশদভাবে বললে ভালো হবে। চোখের ভেতর একটি এঙ্গেল রয়েছে। আমাদের চোখের সামনে যে কর্নিয়া ও আইরিস, এর মাঝখানে একটি এঙ্গেল রয়েছে। চোখের ভেতর যে পানি প্রবাহিত হয়, এটি চোখে পুষ্টি দেয়। চোখের যে সমস্ত গঠন এগুলোর কিন্তু রক্ত সরবরাহ নেই। কারণ রক্ত সরবরাহ থাকলে আমরা দেখতে পারতাম না। এই যে রক্ত সরবরাহ নেই, তাহলে এর পুষ্টি কোথা থেকে আসে? পানি দিয়ে। যে পানিটি রক্ত থেকে তৈরি হয়। আবার চোখের ভেতর প্রবাহিত হয়ে পুষ্টি দিয়ে বেরিয়ে যায়। এই যে এঙ্গেল এটি যদি খোলা থাকে এবং গ্লুকোমা হয় একে বলি, ‘ওপেন এঙ্গেল গ্লুকোমা’। আবার কিছু রোগী আছে যাদের এঙ্গেলটা ন্যারো (সরু) হয়ে যায়। পানি যেতে পারছে না। তাহলে আমরা দেখলাম প্রধানত দুটি গ্লুকোমা। একটি ন্যারো এঙ্গেল আরেকটি ওপেন এঙ্গেল। ওপেন এঙ্গেল গ্লুকোমায় সাধারণত লক্ষণ থাকে না। কিন্তু ন্যারো এঙ্গেল গ্লুকোমা যাদের তাদের কিন্তু লক্ষণ থাকে। কী থাকে? যখন চাপটা অনেক হবে তখন চোখে ব্যথা হবে, চোখে কম দেখবেন। এত ব্যথা হবে যে হাত দিয়ে চোখ ধরে বসে থাকবেন। বিছানায় গড়াগড়ি করবেন। অনেক সময় বমি হতে পারে। মানুষ মনে করতে পারে, তার বোধ হয় পেটের সমস্যা হয়েছে। এই সমস্যাগুলো অনেক সময় হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ওনারা লাইটের চারদিকে রংধনুর মতো রং দেখতে পারেন। এ রকম কিছু কিছু উপসর্গ আছে।
আর ওপেন এঙ্গেল গ্লুকোমার ক্ষেত্রে আমরা যেটা বলি সাধারণত কোনো উপসর্গ নেই। কিন্তু অনেক বুদ্ধিমান রোগী আমাদের বলেন যে তার প্রায়ই মাথাব্যথা হয়। আবার আমরা তো জানি বছরে একবার চশমার পাওয়ার পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু আমাকে দুই মাস পর পর কেন করতে হচ্ছে। কারণ, তাদের পাওয়ার বারবার পরিবর্তন হয়। এই জিনিসগুলো কিছুটা আমরা বুঝতে পারি। তখন আমরা বুঝতে পারি যে, গ্লুকোমা থাকতে পারে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রোগীরা বুঝতে পারেন না। তাহলে রোগী জানবে কীভাবে? এটা আসলে চিকিৎসকের কাজ। এটা চক্ষু বিশেষজ্ঞদের কাজ।
আপনি আমার কাছে যখন আসবেন যে কোনো কারণে, হয়তো আপনার চোখে পাওয়ার লাগে। আমার কাজ হবে আপনার চাপটা দেখা। আপনার চোখের ভেতর গ্লুকোমার কোনো লক্ষণ আছে কি না পরীক্ষা করা। আমরা যে কথা বলছিলাম যে, অপটিক নার্ভ যে কোনো কারণে ক্ষয় হয়ে যায়, ক্ষয় হলে ওখানে ক্ষতি হয়ে যায়। সেটা হচ্ছে কি না এটা দেখব। যদি আমি সন্দেহ করি তাহলে আপনার চোখের পাশের দৃষ্টিটি পরীক্ষা করব। যদি আরো সমস্যা হয় ওসিটি করে চোখের স্নায়ুর যে ভাগগুলো আছে সেগুলো পরীক্ষা করে দেখব। দেখে আমি রোগ নির্ণয় করব গ্লুকোমা হয়েছে কি হয়নি। তাই ডাক্তারের করণীয় বিষয়টি দেখা।
তবে সম্মানিত রোগীদেরও করণীয় আছে। সেটি হলো সচেতনতা বাড়ানো। গ্লুকোমা হতে পারে, এটি জানা থাকা। প্রতিবছর একবার তার চোখের চাপ পরীক্ষা করতে হবে। সাধারণত ৪০ বছর বয়সের পরেই কিন্তু গ্লুকোমা বেশি দেখা দেয়। তাহলে ৪০ বছর বয়সের পর প্রতিবছর একবার চোখের চিকিৎসককে দেখাতে হবে। এই সচেতনতা আমাদের রোগীদের মধ্যে আসতে হবে। তাহলে রোগ নির্ণয়টা দ্রুত হবে। প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় গ্লুকোমা প্রতিকারের হাতিয়ার।
কারণ ৩০ ভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর যদি রোগটি নির্ণয় হয়, তাহলে আপনি চিকিৎসা করলে বাকি ৭০ ভাগ সারা জীবন ভালো থাকবে। কিন্তু আপনি যদি ৯০ ভাগ ক্ষতির পর আমার কাছে আসেন, সেটা কখনোই ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু ১০ ভাগের চিকিৎসা আমার কাছে আছে। সুতরাং আপনি বুঝতে পারছেন আমার যদি রোগ নির্ণয় করতেই হয়, তাহলে আগে করতে পারলে রোগী সারা জীবন ভালো থাকতে পারবেন।

ফিচার ডেস্ক