যমুনায় ভাসলো লখিন্দরের ভেলা, লোক-ঐতিহ্য শাওনে ডালা
নদীমাতৃক বাংলার লোক-ঐতিহ্য ‘শাওনে ডালা’ শেষ হলো, যমুনায় ভাসলো লখিন্দরের ভেলা। ঐতিহ্যবাহী এ কর্মকান্ডে তরুণদের যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব লুবনা মারিয়াম। গত ১৮ আগস্ট যমুনা নদীতে ছিল ‘শাওনে ডালা’র এ বছরের আয়োজন।
টাঙ্গাইলের কিছু এলাকায় এখনও চর্চা হয় ‘শাওনে ডালা’। মূলত নদী ঘেরা অঞ্চলের সাপুরে, ওঝারা এই চর্চা বাঁচিয়ে রেখেছে। মুসলমান ওঝারা বছরের এই সময়ে সাপ বা মনসাকে নৈবেদ্য দেন। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় ওইদিন দিনব্যাপী ছিল সেই আয়োজন।
এ বছর এই ভ্রমণে অংশ নেন আগ্রহী একঝাঁক অতিথি। কর্মসূচির অংশ হিসেবে তারা উৎসব উপলক্ষে আয়োজিত মেলা ঘুরে দেখেন এবং অংশ নেন ঐতিহ্যবাহী নৌযাত্রায়। পাশাপাশি ঐতিহাসিক মহেড়া জমিদার বাড়িও ঘুরিয়ে দেখানো হয় অতিথিদের। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শারমিন মুরশিদ।
উৎসবে অংশ নিয়ে এক অনাকাঙ্ক্ষিত অভিজ্ঞতার কথা ফেসবুকে লিখেছেন লুবনা মারিয়াম। দুপুরের খাবারের বিরতিতে মির্জাপুরের হাটসংলগ্ন ফতেহপুর উচ্চবিদ্যালয়ের নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাক্ষৎ হয় অতিথিদের। অভিজ্ঞতার ভাগ দিতে গিয়ে লুবনা মারিয়াম লেখেন, ‘উৎসবস্থল থেকে এত কাছাকাছি থাকলেও শিক্ষার্থীরা “শাওনে ডালা” সম্পর্কে খুব কমই জানে।’ তার ভাষায়, ‘এটি এমন এক শতাব্দীপ্রাচীন নদীমাতৃক উৎসব, যা কার্যত তাদের নিজেদের বাড়ির আঙিনাতেই অনুষ্ঠিত হয়।’
লুবনা মারিয়মের মতে, এই উৎসব বাংলার দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যও তুলে ধরে। কারণ হিন্দু দেবতার সম্মানে আয়োজিত এই আচার-অনুষ্ঠানে মুসলিম সম্প্রদায়ও অংশ নেন। তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে তাদের চারপাশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এই গবেষক। দেশের জীবন্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে তরুণদের নিবিড়ভাবে যুক্ত করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে তার এ অভিজ্ঞতা।
লুবনা মারিয়াম লিখেছেন, ‘এটি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে, তরুণদের তাদের জীবন্ত সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত করতে স্কুলগুলোর আরও জরুরি ও সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।’
তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগের মাধ্যমে ‘কৌতূহল যেন দূরত্বকে জয় করতে পারে, জ্ঞান যেন অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে এবং বাংলার অভিন্ন ঐতিহ্য যেন দৃশ্যমান, বোধগম্য ও জীবন্ত থাকে’-তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
দিনব্যাপী এই ভ্রমণ শুরু হয় সকাল ৬টায়। ঢাকার থেকে রওনা দেওয়া একটি দল সকাল ৯টায় এলেঙ্গা পৌঁছায়। নাশতার পর তারা উৎসবের মেলা ঘুরে দেখেন। সকাল ১০টায় মূল ‘শাওনে ডালা’ আচার-অনুষ্ঠান শুরু হয়। এরপর সাতঘাট ঘুরে মনসাকে নৈবেদ্য দেন ওঝার দল। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নৌকায় অতিথিদের হালকা খাবার ও চা পরিবেশন করা হয়। দুপুর ২টায় ফতেহপুর ঘাটে ছিল মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত উৎসবের আচার-অনুষ্ঠান চলে। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় দলটি মির্জাপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়।
এর আগে (১৭ আগস্ট) সোমবার শাওনে ডালা উপলক্ষে টাঙ্গাইলের কালিহাতীর এলেঙ্গা জমিদারবাড়িতে দুই দিনব্যাপী মেলার উদ্বোধন করা হয়েছে। সকালে সাধনা, ব্রতি ও জাতীয় জাদুঘরের আয়োজনে এলেঙ্গা জমিদারবাড়ি মাঠে এ মেলার উদ্বোধন করা হয়। মেলার উদ্বোধন করেন কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আক্তার। গবেষণা ও গ্রামীণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা লুবনা মরিয়মের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, কালিহাতী থানার অফিসার ইনচার্জ কাইয়ুম খান সিদ্দিকী।
বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় লোক-ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং তা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে প্রতি বছর এই উৎসব আয়োজনে সহযোগিতা করছে সাংস্কৃতিক সংস্থা সাধনা।

ফিচার ডেস্ক