ভোটারদের প্রলুব্ধ করতে টেলিভিশন, সাইকেল ও স্বর্ণালঙ্কার
ভারতে নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করতে ভোটারদের উপহার বা বিনামূল্যে জিনিসপত্র প্রদানের কৌশলটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশটিতে প্রচণ্ড রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এ ধরনের উপহার বা সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রেও কিছু পরিবর্তন এসেছে। ভোটারদের প্রলুব্ধ করতে টেলিভিশন সেট থেকে শুরু করে সাইকেল, এমনকি কখনো কখনো স্বর্ণালঙ্কারও প্রদান করা হয়েছে। কল্যাণমুখী অর্থনীতি ও নির্বাচন-পূর্ব জনপ্রিয়তার কৌশলের মধ্যে থাকা সূক্ষ্ম ব্যবধানও কমিয়ে দিচ্ছে এই কৌশল। খবর বিবিসির।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নির্বাচনে জয়ের ক্ষেত্রে নগদ অর্থ প্রদান, বিশেষ করে নারীদের; সব পর্যায়ের রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি জনপ্রিয় কৌশল হয়ে উঠেছে। ভারতের সবচেয়ে দরিদ্র রাজ্য বিহারে গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন জোটের বিশাল জয়ের পেছনে অবদান রেখেছে সেখানকার নারীদের জন্য নগদ ১০ হাজার রুপি প্রদানের কৌশলটি। নির্বাচনে রেকর্ড সংখ্যক নারী ভোট দিয়েছেন।
গত বছর নির্বাচনের আগে মহারাষ্ট্রের মতো অন্যান্য রাজ্যেও মোদির দল একই রকমভাবে নারী ভোটারদের লক্ষ্য করে আর্থিক সহায়তা প্রদানের কৌশল গ্রহণ করেছিল। কিছু রাজ্যে নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলোও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদ জিন ড্রেজ বলেন, ‘উপযোগী’ ও ‘অপচয়কারী’ কৌশলের মধ্যে পার্থক্য করা গুরুত্বপূর্ণ, নির্বাচনের সময় প্রতিশ্রুতি আদায়ের মাধ্যমেই ভারতের দরিদ্র মানুষেরা তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের কাছ থেকে কিছু অর্জন করেন।
অন্যদিকে নিজ দলকে এই ধরনের উপহার প্রদানের বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মরেন্দ্র মোদি। তিনি নির্বাচনি উপহারকে মিষ্টি বিতরণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ভারতের সর্বোচ্চ আদালতও ২০২৩ সালে নির্বাচনের সময় এই ধরনের ‘অযৌক্তিক’ বিনামূল্যে জিনিসপত্র বিতরণ রোধের চেষ্টা করেছিলেন।
নির্বাচনি টোপ হিসেবে বিনামূল্যে জিনিসপত্র প্রদানের এই কৌশল রাজনৈতিক দলগুলো ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। তবে এতে ভারতে নির্বাচনগুলো ‘আর্থিক সুবিধা’ প্রদানের সংস্কৃতি দিয়ে প্রভাবিত হচ্ছে, যা রাজ্যগুলোর অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলছে।
এমকে গ্লোবালের গবেষণা অনুসারে, বিহার যথেষ্ট আর্থিক চাপের সম্মুখীন হচ্ছে। রাজ্যের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি তার মোট জিডিপির ৬ শতাংশ। এরপরেও রাজ্যটি জিডিপির ৪ শতাংশ পরিমাণ প্রাক-নির্বাচনি প্রকল্প ঘোষণা করেছে। অথচ এই অর্থ কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পাওয়ার জন্য ব্যয় করা যেত।
এমকে গ্লোবালের মতে, বিহার এমন অনেক রাজ্যের মধ্যে একটি উদাহরণ, যেখানে নির্বিচারে নির্বাচনি জনপ্রিয়তা পেতে এই ধরনের অনুশীলন করা হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, আর্থিকভাবে সচেতন রাজ্যগুলোতেও এখন রাজনৈতিক দলগুলোর এই কৌশলের কবলে। এর ফলে বাজেট বহির্ভূত ব্যয় রোধের জন্য রাজ্যগুলোতে বাধ্যতামূলক রাজস্ব ঘাটতি জিডিপির সীমা ৩ শতাংশের মধ্যে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। কিছু জরিপ অনুসারে, ভারতের ২৯টি রাজ্যের মধ্যে ২১টি এই ৩ শতাংশ ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
এই ধরনের জনপ্রিয়তা যে টেকসই নয়, তা স্পষ্ট করে তুলেছে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জোটের ‘লাড়কি বহিন’ আর্থিক সহায়তা প্রকল্প। এমকে গ্লোবালের মতে, এই প্রকল্পের ফলে মহারাষ্ট্র রাজ্যের ঘাটতি শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বাচন শেষ হওয়ার পরই সরকার তাদের কিছু প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও রাজ্য পর্যায়ের ঋণের ওপর এই ধরনের ভর্তুকির ক্রমবর্ধমান বোঝাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান উদ্বেগ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (আরবিআই) তথ্য অনুসারে, যদিও গত দশকের তুলনায় ২০২৪ সালের মার্চ নাগাদ ভারতীয় রাজ্যগুলোর সামগ্রিক ঋণ জিডিপির প্রায় ২৮ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে, তবুও এটি প্রস্তাবিত সীমা ২০ শতাংশের অনেক ওপরে রয়েছে।
আরবিআই জানায়, রাজ্যগুলোকে তাদের ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণ ও যুক্তিসঙ্গত করতে হবে, যাতে এই ধরনের খরচ উৎপাদনশীল ব্যয়কে বাধাগ্রস্ত না করে।
বিহারে বিনামূল্যে জিনিসপত্র প্রদানের এই কৌশলে সাফল্য আসায় অন্যান্য রাজ্যের আসন্ন নির্বাচনেও এটি দেখা যেতে পারে। রিজার্ভ ব্যাংকের সতর্কবার্তায় মনোযোগ দেওয়ার সম্ভাবনা কম। এমকে গ্লোবাল অর্থনীতিবিদ মেধাবী অরোরা ও হর্ষাল প্যাটেল বলেছেন, বিহার নির্বাচনের ফলাফল বিনামূল্যে জিনিসপত্র প্রদানের এই কৌশলের ব্যবহার আরও জোরালো করেছে। তামিলনাড়ু, কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গে আগামী বছরের নির্বাচনে এই প্রতিযোগিতা সর্বনিম্ন পর্যায়েও অব্যাহত থাকবে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক