গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহার হতে পারে : যুক্তরাষ্ট্র
গ্রিনল্যান্ড দখলের বিষয়ে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। হোয়াইট হাউস বলেছে, প্রয়োজনে মার্কিন সেনাবাহিনী ব্যবহার করা হতে পারে। এদিকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ও কানাডা একযোগে এই হুমকি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, গ্রিনল্যান্ড তার জনগণের এবং এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার তাদেরই। খবর আল জাজিরার।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস জানায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছেন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আর্কটিক অঞ্চলে প্রতিপক্ষ শক্তিকে প্রতিহত করতে গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
হোয়াইট হাউসের ভাষায়, এই গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিগত লক্ষ্য অর্জনে প্রেসিডেন্ট ও তার দল বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে। কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে মার্কিন সামরিক বাহিনী ব্যবহার করাও সবসময় একটি বিকল্প।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের মিত্র ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড দখলের যে কোনো চেষ্টা ন্যাটো জোটে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করবে এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ইউরোপীয় নেতাদের বিভাজন আরও গভীর করবে বলে বিশ্লেষকদের মত।
তবে বিরোধিতায় পিছু হটছেন না ট্রাম্প। ২০১৯ সালে প্রথম মেয়াদে উত্থাপিত গ্রিনল্যান্ডে আগ্রহ আবার জোরালো হয়েছে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পর। ট্রাম্প দাবি করেছেন, গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে না থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, দ্বীপটি ‘রুশ ও চীনা জাহাজে ভরে গেছে’ এবং ডেনমার্ক একে সুরক্ষা দিতে সক্ষম নয়।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় দ্বীপ গ্রিনল্যান্ডের জনসংখ্যা মাত্র ৫৭ হাজার। দ্বীপটির সরকার বহুবার স্পষ্ট করে জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হতে চায় না।
ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মাঝামাঝি কৌশলগত অবস্থানের কারণে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, দ্বীপটির খনিজ সম্পদ ওয়াশিংটনের চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যেও সহায়ক।
‘গ্রিনল্যান্ড তার জনগণের’
হোয়াইট হাউসের বক্তব্যের পরপরই ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, পোল্যান্ড, স্পেন ও যুক্তরাজ্যের নেতারা ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের সঙ্গে যৌথ বিবৃতিতে বলেন, গ্রিনল্যান্ড তার জনগণের। ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড—এই দুই পক্ষই কেবল তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার রাখে।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও গ্রিনল্যান্ডের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ঘোষণা দেন, ইনুইট বংশোদ্ভূত গভর্নর জেনারেল মেরি সাইমন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিতা আনন্দ আগামী মাসে গ্রিনল্যান্ড সফর করবেন।
এছাড়া ফিনল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও আলাদা বিবৃতিতে গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তারা জানান, আর্কটিক নিরাপত্তায় বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে এবং ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়ে আরও পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক সতর্ক করে বলেন, ন্যাটোর কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি জোটের বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করে দেয়। এতে ন্যাটোর অস্তিত্বের অর্থই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেন্স-ফ্রেডেরিক নিলসেন ইউরোপীয় নেতাদের সংহতির জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘সম্মানজনক সংলাপ’ এর আহ্বান জানান।
ডেনমার্ক গ্রিনল্যান্ড রক্ষা করতে অক্ষম, ট্রাম্পের এমন দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, গ্রিনল্যান্ডে চীনা বিনিয়োগ বা যুদ্ধজাহাজে ভরে গেছে—এই ধারণার সঙ্গে আমরা একমত নই।
তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে দ্বীপটিতে আরও বিনিয়োগের জন্য স্বাগত জানান।
গ্রিনল্যান্ড সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে একযোগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে জরুরি বৈঠকের অনুরোধ করা হয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প নিযুক্ত গ্রিনল্যান্ড বিষয়ক বিশেষ দূত ও লুইজিয়ানার গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রি বলেন, তিনি ডেনমার্ক বা ইউরোপীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে নয়, সরাসরি গ্রিনল্যান্ডের জনগণের সঙ্গে কথা বলতে চান।
অন্যদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, কংগ্রেসে এক ব্রিফিংয়ে মার্কো রুবিও বলেছেন—এই হুমকি তাৎক্ষণিক সামরিক আগ্রাসনের ইঙ্গিত নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কেনা।
তবে হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব নিয়ে উদ্বেগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, বাস্তব বিশ্ব শক্তি ও ক্ষমতা দ্বারা পরিচালিত।
কংগ্রেসের কিছু রিপাবলিকানসহ উভয় দলের আইনপ্রণেতারা এ অবস্থানের বিরোধিতা করেছেন। সিনেটর জিন শাহিন ও থম টিলিস এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড যখন স্পষ্ট করেছে যে গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত তার চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা মানা এবং ডেনমার্কের সার্বভৌমত্বকে সম্মান করা।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক