ক্রিকেটে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর আধিপত্য দেখাচ্ছে ভারত
২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি ভারতের ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের একটি নির্দেশেই কার্যত শেষ হয়ে যায় আইপিএলে বাংলাদেশের একমাত্র খেলোয়াড় মুস্তাফিজুর রহমানের মৌসুম।
কলকাতাভিত্তিক টি–টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজি কলকাতা নাইট রাইডার্সকে (কেকেআর) বাংলাদেশি এই ফাস্ট বোলারকে ছেড়ে দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। শাহরুখ খানের রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট মালিকানাধীন দলটি এই নির্দেশ পালন করে।
চোট, ফর্ম বা চুক্তিজনিত কোনো কারণে নয়—বরং ‘চারপাশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি’ দেখিয়ে তাকে বাদ দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি মূলত ২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়ার পর থেকে ভারত–বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রতিফলন।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই মুস্তাফিজ পাকিস্তান সুপার লিগে (পিএসএল) চুক্তিবদ্ধ হন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ভারতের এই হস্তক্ষেপকে ‘বৈষম্যমূলক ও অপমানজনক’ বলে অভিহিত করে। বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচারও বন্ধ হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) পর্যন্ত এই ঘটনায় কূটনৈতিক টানাপোড়েনে জড়িয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যে বিষয়টি হওয়ার কথা ছিল একটি স্বাভাবিক খেলোয়াড় লেনদেন—সেটিই এখন ক্রিকেটকে রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হিসেবে দেখাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেট ছিল উপমহাদেশের ‘সফট পাওয়ার’ ভাষা—যুদ্ধ, সীমান্ত বন্ধ বা কূটনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যেও টিকে থাকা এক যৌথ আবেগ। কিন্তু আজ সেই ভাষা নতুনভাবে লেখা হচ্ছে।
বিশ্ব ক্রিকেটের আর্থিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে ভারত তার আধিপত্য ক্রমেই ব্যবহার করছে প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর—বিশেষ করে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের ওপর।
ড্রেসিংরুমে ঢুকছে রাজনীতি
আইপিএল ২০২৬ মৌসুমের আগে কেকেআর মুস্তাফিজকে ৯ কােটি ২০ লাখ রুপিতে দলে নিয়েছিল। কিন্তু বিসিসিআইয়ের নির্দেশে তাঁকে ছাড়তে বাধ্য হয় দলটি। চোটজনিত কোনো কারণে না হওয়ায় ক্ষতিপূরণ পাওয়ার সম্ভাবনাও ছিল না। মুস্তাফিজ আট বছর পর পিএসএলে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন এবং ২১ জানুয়ারির ড্রাফটের আগে তার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
বিসিবি নিরাপত্তার বিষয় উল্লেখ করে আইসিসির কাছে অনুরোধ জানায়, আসন্ন টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করতে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ সরকার সারা দেশে আইপিএল সম্প্রচার বন্ধ করে দেয়।
৭ জানুয়ারি বিসিবি জানায়, আইসিসি বাংলাদেশকে পূর্ণ নিরাপত্তা ও নিরবচ্ছিন্ন অংশগ্রহণের আশ্বাস দিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ম্যাচ ফেব্রুয়ারিতে কলকাতা ও মুম্বাইতেই অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ভারতীয় রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া
বিজেপি নেতা নভনীত রানা বলেছেন, বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের প্রেক্ষাপটে কোনো বাংলাদেশি খেলোয়াড় বা তারকাকে ভারতে ‘আপ্যায়ন করা উচিত নয়।’ অন্যদিকে কংগ্রেস নেতা শশী থারুর বলেছেন, খেলাধুলাকে রাজনীতির বাইরে রাখা জরুরি।
ধারাবাহিকতা এবং ভারতীয় প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, মুস্তাফিজ ইস্যু কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আইসিসির প্রধান জয় শাহ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পুত্র। আইপিএল বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ এবং বিশ্ব ক্রিকেটের প্রায় ৮০ শতাংশ আয় আসে ভারত থেকে। এই আর্থিক ক্ষমতাই ক্রিকেটকে ভারতের কৌশলগত সম্পদে পরিণত করেছে।
২০২৪ সালে শেখ হাসিনার পতনের সময় সহিংসতায় জাতিসংঘের হিসাবে প্রায় এক হাজার ৪০০ জন নিহত হন। পরে দিল্লিতে আশ্রয় নেওয়া হাসিনাকে ফেরত পাঠাতে ভারত অস্বীকৃতি জানায়। ঢাকার একটি ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিলেও ভারত ফেরত দেয়নি। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব বেড়ে যায়।
এই পটভূমিতে মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ায় ভারতের ভেতরেও সমালোচনা হয়েছে। সাংবাদিক বীর সাংভি লিখেছেন, বিসিসিআই সাম্প্রদায়িক চাপের কাছে নতি স্বীকার করেছে এবং একটি ক্রীড়া ইস্যুকে কূটনৈতিক বিব্রতকর ঘটনায় পরিণত করেছে।
এশিয়া কাপ বিতর্ক
২০২৫ সালের এশিয়া কাপে ভারত সরকার পাকিস্তানে দল পাঠাতে রাজি হয়নি। শেষ পর্যন্ত হাইব্রিড মডেলে টুর্নামেন্ট হয়—ভারত খেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। তিন ম্যাচেই ভারত পাকিস্তানকে হারালেও মাঠে করমর্দন পর্যন্ত করেনি ভারতীয় দল।
ফাইনালে পাকিস্তানকে হারিয়ে শিরোপা জিতলেও এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের সভাপতি ও পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভির হাত থেকে ট্রফি নিতে অস্বীকৃতি জানায় ভারত। ট্রফিটি এখনো দুবাইয়ে এসিসির সদর দপ্তরে পড়ে আছে।
বন্ধন থেকে বিভাজন
একসময় ভারত–বাংলাদেশের ক্রিকেট সম্পর্ক ছিল মসৃণ। দ্বিপক্ষীয় সিরিজ হতো নিয়মিত, আইপিএলেও খেলতেন বাংলাদেশিরা। মুস্তাফিজের ঘটনা সেই সম্পর্কের বড় মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
২০০৪ সালে ভারতের পাকিস্তান সফরের ‘ফ্রেন্ডশিপ সিরিজ’-এর সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ী সৌরভ গাঙ্গুলির হাতে তুলে দিয়েছিলেন লেখা ব্যাট—“খেলই নেহি, দিল ভি জিতিয়ে”। অর্থাৎ শুধু ম্যাচ নয়, মনও জিতো।
আজ সেই ক্রিকেটই পরিণত হচ্ছে শর্তসাপেক্ষ প্রবেশাধিকার এবং রাজনৈতিক চাপের একটি হাতিয়ার হিসেবে।
ক্রীড়া সাংবাদিক নিশান্ত কাপুর বলেন, একজন খেলোয়াড়কে কেবল রাজনৈতিক কারণে বাদ দেওয়া একেবারেই ভুল। সে তো একজন ক্রিকেটার—তার দোষ কোথায়?

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক