শীতেও হিমালয়ে নেই তুষারপাত, বিজ্ঞানীদের সতর্কতা
শীত মৌসুমের যে সময়ে হিমালয় পর্বতশ্রেণি বরফে ঢাকা থাকার কথা, সেই সময়েই অনেক এলাকায় পাহাড় এখন খালি ও পাথুরে হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শীতকালীন তুষারপাত আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ ও জলবায়ু বিজ্ঞানীরা।
তাদের মতে, গত পাঁচ বছরের বেশিরভাগ শীতেই ১৯৮০ থেকে ২০২০ সালের গড় তুষারপাতের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হ্রাস দেখা গেছে। একই সঙ্গে তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে অল্প যে বরফ পড়ছে, তাও দ্রুত গলে যাচ্ছে। নিচু এলাকায় বরফের বদলে বৃষ্টিপাত বাড়ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাব বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। খবর বিবিসির।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, হিমালয়ের অনেক অংশে এখন শীতকালে তথাকথিত ‘স্নো ড্রাউট’ বা বরফখরার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
পানিসংকট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি
বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, তুষারপাত কমে গেলে শুধু হিমালয়ের চেহারাই বদলাবে না, এর প্রভাব পড়বে এ অঞ্চলের শত শত কোটি মানুষের জীবনে ও বাস্তুতন্ত্রে।
শীতকালে জমে থাকা বরফ বসন্তে গলে নদী-নালায় পানি যোগ করে। এই বরফগলা পানিই পানীয় জল, কৃষি সেচ ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান উৎস। কিন্তু তুষারপাত কমে গেলে নদীগুলোর পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে।
এ ছাড়া কম বৃষ্টিপাত ও তুষারপাতের কারণে বনভূমি শুষ্ক হয়ে পড়ছে, যা ভয়াবহ দাবানলের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে পাহাড়ের বরফ ও তুষার ‘সিমেন্টের’ মতো কাজ করে ঢালকে স্থিতিশীল রাখে। সেগুলো কমে যাওয়ায় ভূমিধস, পাথরধস, হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণ ও ধ্বংসাত্মক ধসের ঘটনা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
কতটা ভয়াবহ তুষারপাতের ঘাটতি?
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ডিসেম্বর মাসে উত্তর ভারতের প্রায় সব অঞ্চলে কোনো বৃষ্টিপাত বা তুষারপাতই হয়নি।
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে উত্তর-পশ্চিম ভারতের অনেক এলাকা—উত্তরাখণ্ড, হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখে—দীর্ঘমেয়াদি গড়ের (এলপিএ) তুলনায় প্রায় ৮৬ শতাংশ কম বৃষ্টি ও তুষারপাত হতে পারে।
১৯৭১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত উত্তর ভারতের গড় বৃষ্টিপাত ছিল ১৮৪.৩ মিলিমিটার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো এককালীন ঘটনা নয়।
যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিদ কিয়ারান হান্ট বলেন, বিভিন্ন তথ্যভাণ্ডারের শক্ত প্রমাণ বলছে, হিমালয়ে শীতকালীন বৃষ্টিপাত ও তুষারপাত ধারাবাহিকভাবে কমছে।
২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, পশ্চিম ও মধ্য হিমালয়ের বড় অংশে ১৯৮০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে তুষারপাত কমেছে।
ভারতের আইআইটি জম্মুর গবেষক হেমন্ত সিং জানান, গত পাঁচ বছরে উত্তর-পশ্চিম হিমালয়ে তুষারপাত ৪০ বছরের গড়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে।
নেপাল ও পুরো অঞ্চলের চিত্র
নেপালেও একই ধরনের সংকট দেখা যাচ্ছে। কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিনোদ পোখরেল বলেন, অক্টোবরের পর থেকে নেপালে কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। গত পাঁচ বছরের প্রায় সব শীতই শুষ্ক গেছে।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোথাও কোথাও ভারি তুষারপাত হলেও সেগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন ও চরম ঘটনা—আগের মতো সমানভাবে ছড়িয়ে পড়া শীতকালীন বরফ নয়।
বরফ স্থায়িত্ব রেকর্ড সর্বনিম্ন
২০২৪–২৫ শীতে হিন্দুকুশ–হিমালয় অঞ্চলে বরফের স্থায়িত্ব (স্নো পারসিস্টেন্স) ২৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। যা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২৪ শতাংশ কম বলে জানিয়েছে আইসিমড।
সংস্থাটির মতে, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পাঁচটির চারটি শীতেই বরফ স্থায়িত্ব স্বাভাবিকের নিচে ছিল।
আইসিমড সতর্ক করেছে, হিমালয়ের ১২টি প্রধান নদী অববাহিকায় মোট বার্ষিক পানিপ্রবাহের প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে বরফগলা পানি থেকে। এতে অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানিনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে।
কারণ কী?
বেশিরভাগ আবহাওয়াবিদ শীতকালীন বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার পেছনে পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহ (ওয়েস্টার্ন ডিস্টার্বেন্স) দুর্বল হয়ে পড়াকে দায়ী করছেন। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা এই নিম্নচাপগুলো আগে উত্তর ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে শীতের বৃষ্টি ও তুষারপাত নিশ্চিত করত।
কিয়ারান হান্ট বলেন, পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং কিছু ক্ষেত্রে উত্তরের দিকে সরে যাচ্ছে। ফলে আরব সাগর থেকে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা নিতে পারছে না।
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরও চলতি শীতের পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহকে ‘দুর্বল’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
দ্বিমুখী সংকটে হিমালয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় এখন দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে—একদিকে দ্রুত হিমবাহ গলছে, অন্যদিকে শীতকালীন তুষারপাত কমে যাচ্ছে। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাব ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার পরিবেশ, পানি ও মানুষের জীবনযাত্রায় ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক