ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ব্যবহৃত পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্র কতটা ভয়ঙ্কর
ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র প্রথমবারের মতো প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (পিআরএসএম) ব্যবহার করেছে। বুধবার (৪ মার্চ) মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এ তথ্য জানিয়েছে। আজ শুক্রবার যুদ্ধ সপ্তম দিনে প্রবেশ করেছে, ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে হামলা অব্যাহত রয়েছে। তবে পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রগুলো কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল এবং ইরানের কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছিল, তা স্পষ্ট নয়। তাহলে পিআরএসএম কী এবং কেন এটি তাৎপর্যপূর্ণ। কেন এটি প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্র ব্যবহার করছে, এ নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর নির্মাতা হলো মেরিল্যান্ডের মার্কিন-সদর দপ্তরের প্রতিরক্ষা সংস্থা লকহিড মার্টিন। প্রতিষ্ঠানটি এটিকে দূর-পাল্লার নির্ভুল আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করেছে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন সেনাবাহিনীতে প্রথম পিআরএসএম সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানটি।
লকহিড মার্টিন জানায়, পিআরএসএম ৬০ থেকে ৪৯৯ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে আরও বলা হয়, পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এমএলআরএস এম২৭০ ও এইচআইএমএআরএস ধরনের লঞ্চারগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উভয় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো লকহিড মার্টিন তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সেনাবাহিনী এসব ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে।
এমএলআরএস মানে মাল্টিপল-লঞ্চ রকেট সিস্টেম, যা ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে ব্যবহৃত হয়। যুক্তরাজ্য ২০২২ সালে ইউক্রেনে নির্দিষ্ট সংখ্যক এমএলআরএস পাঠিয়েছিল। আইএমএআরএস মানে হাই মোবিলিটি আর্টিলারি রকেট সিস্টেম, যা ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনে সরবরাহ করেছিল।
এম-১৪২ এইচআইএমএআরএস হলো উচ্চ প্রযুক্তির এবং হালকা ওজনের রকেট লঞ্চার। এতে চাকা সংযুক্ত থাকায় যুদ্ধক্ষেত্রে এটি আরও তৎপর ও স্থানান্তর করা যায় সহজে। প্রতিটি ইউনিট ছয়টি জিপিএস-নির্দেশিত রকেট, অথবা আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (এটিএসিএমএস) এবং পিআরএসএমের মতো বৃহত্তর ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে পারে। এটি মাত্র এক মিনিটের মধ্যে রিলোড করা সম্ভব অল্প সংখ্যক ক্রু দিয়ে।
লকহিড মার্টিনের ওয়েবসাইটে আরও বলা হয়, পিআরএসএম দ্রুত বিকশিত হতে পারে। এই দূরপাল্লার নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন সেনাবাহিনীর জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উৎপাদন ও সরবরাহ করতে প্রস্তুত প্রতিষ্ঠানটি।
পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রগুলোতে ‘ওপেন সিস্টেম আর্কিটেকচার’ রয়েছে, অর্থাৎ এতে নতুন উপাদান সংযুক্ত করা, যন্ত্রাংশ উন্নত করা এবং অন্যান্য কোম্পানির সরঞ্জামগুলোর সঙ্গে এটি সমন্বিত করে কাজ করা সহজ। একইভাবে এগুলো সহজে নির্মাণ ও সামঞ্জস্য করা সম্ভব। এতে এটির উপাদানগুলো সহজে পরিবর্তন করা যায়।
নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এগুলোতে ‘আইএম এনার্জেটিক পেলোড’ বা ‘ইনসেনসিটিভ মিনিশনস এনার্জেটিক পেলোডও’ রয়েছে, যা বিস্ফোরণকে আরও নির্বিঘ্ন করে তোলে। এর অর্থ হলো ওয়ারহেডটি এমন বিস্ফোরক দিয়ে তৈরি যা আগুন, নিক্ষেপণকালে বা কোনো দুর্ঘটনাক্রমে আঘাতের ফলে বিস্ফোরিত হওয়ার সম্ভাবনা কম, কিন্তু লক্ষ্যবস্তু অনুসারে কার্যকর করলে সঠিকভাবে বিস্ফোরিত হয়।
পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর বিশেষত্ব
পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শেষ পর্যন্ত এইচআইএমএআরএস লঞ্চার থেকে নিক্ষেপ করা এটিএসিএমগুলোকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। এতে ক্ষেপণাস্ত্র বহনকারী যান পরিবর্তন না করেই এগুলোর পাল্লা উল্লেখযোগ্যভাবে ৩০০ থেকে ৪৯৯ মিলোমিটারের বেশি হয়।
পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্রগুলো এটিএসিএম থেকে দ্বিগুণ ‘ক্ষেপণাস্ত্র লোড’ করতে পারে। এ ছাড়া একটি এইচআইএমএআরএস লঞ্চার তার পডে একটি এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র বহন করতে সক্ষম, কিন্তু এটি প্রতি পডে দুটি পিআরএসএম বহন করতে পারে।
পিআরএসএম কি যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত সুবিধা দেয়?
সেন্টকম নিশ্চিত করেছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আক্রমণে পিআরএসএম ব্যবহার করা হয়েছে। এ অভিযানের কোডনাম অপারেশন এপিক ফিউরি, যা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়।
পিআরএসএম মার্কিন সেনাবাহিনীর পূর্ব-বিদ্যমান দূর-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ইরানের ৪০০ কিলোমিটারের মধ্যে কিছু অঞ্চল আছে, যেমন কুয়েত, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমানের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে, বিশেষ করে মুসান্দাম উপদ্বীপে, যেখানে মার্কিন সম্পদ এবং সৈন্যদের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব অঞ্চল থেকে যুক্তরাষ্ট্র পিএসআরএমগুলো অন্যান্য দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে ব্যবহার করছে, যেমন কম খরচের মানবহীন কমব্যাট অ্যাটাক সিস্টেম (এলইউসিএএস) ওয়ান-ওয়ে ড্রোন, এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন, এটিএসিএম ও টমাহক ক্রুজ মিসাইল। এর মধ্যে এলইউসিএএস একমুখী ড্রোনের পাল্লা প্রায় ৮০০ কিলোমিটার, এটিএসিএমের পাল্লা প্রায় ৩০০ কিলোমিটার এবং টমাহক ক্রুজ মিসাইলের পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে পিআরএসএম ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার কেন তাৎপর্যপূর্ণ?
এই ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা তাৎপর্যপূর্ণ কারণ রাশিয়ার সঙ্গে করা ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস (আইএনএফ) চুক্তির অধীনে এটি অনুমোদিত নয়, তবে এ চুক্তি থেকে ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয়। এটি ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর চুক্তিতে আরোপিত সর্বোচ্চ ৫০০ কিলোমিটারের পাল্লা অতিক্রম করতে পারে।
১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা রোনাল্ড রিগ্যান এবং মিখাইল গর্বাচেভ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এ চুক্তিতে ইউরোপের ৫০০ থেকে ৫৫০০ কিলোমিটার দূরবর্তী স্থলভিত্তিক পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং মাঝারি পাল্লার অস্ত্রের ব্যবহার নিষিদ্ধের করার চেষ্টা করা হয়। চুক্তিটি স্থগিত করার ফলে ওয়াশিংটন তার নিজস্ব মাঝারি-পাল্লার, স্থল-ভিত্তিক সমরাস্ত্র উন্নয়নের পুনরায় সুযোগ পায়।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক