ইরান-সৌদি সংঘাতে কতদিন নিরপেক্ষ থাকতে পারবে পাকিস্তান?
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ শীর্ষ নেতৃত্বের পতন ও সৌদি আরবে ইরানের অব্যাহত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় পাকিস্তান এখন ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সামরিক ও কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি। ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইরানি সীমান্ত ও সৌদি আরবের সঙ্গে গভীর সামরিক চুক্তির মারপ্যাঁচে পাকিস্তান তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান আসিম মুনির রিয়াদে একটি ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির মূল শর্ত হলো—এক দেশের ওপর আক্রমণ মানেই উভয়ের ওপর আক্রমণ। ন্যাটোর ধাঁচে তৈরি এই চুক্তির কারণেই এখন রিয়াদ পাকিস্তানের কাছে সামরিক সহায়তা দাবি করছে। ৫ মার্চ প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ৬ মার্চ সেনাপ্রধান আসিম মুনির জরুরি ভিত্তিতে রিয়াদে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিশ্লেষক উমর করিমের মতে, ‘এটিই হবে সৌদি আরবের শেষ পরীক্ষা; পাকিস্তান এবার প্রতিশ্রুতি না রাখলে এই সম্পর্ক অপূরণীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার ইরান ও সৌদির মধ্যে ভারসাম্য রাখতে ‘শাটল যোগাযোগ’ শুরু করেছেন। তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে সরাসরি জানিয়েছে, সৌদির সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে তিনি রিয়াদের কাছ থেকে এই নিশ্চয়তাও নিয়েছেন, ইরানে হামলার জন্য সৌদি ভূমি ব্যবহৃত হবে না। এর বিনিময়ে ইরানও তাদের আকাশসীমা ও জলসীমা নিরাপদ রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যদিও ৬ মার্চের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সেই প্রতিশ্রুতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা চরম ঝুঁকিতে
খামেনির মৃত্যুর পর পাকিস্তানে শিয়া-সুন্নি উত্তেজনায় ২৩ জন নিহত হয়েছে। গিলগিট-বালতিস্তানে সেনাবাহিনী মোতায়েন ও তিন দিনের কারফিউ জারি করতে হয়েছে।
জয়নাবিয়ুন ব্রিগেডের হুমকি : ইরান সমর্থিত এই মিলিশিয়া বাহিনীতে হাজার হাজার পাকিস্তানি যোদ্ধা রয়েছে। বিশ্লেষক আমির রানা সতর্ক করে বলেছেন, পাকিস্তান সৌদির পক্ষ নিলে এই যোদ্ধারা দেশের ভেতরেই সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করতে পারে।
বেলুচিস্তান সংকট : ইরানের সীমান্তবর্তী বেলুচিস্তান প্রদেশ আগে থেকেই অস্থিতিশীল। নতুন সংঘাত এই অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে আরও উসকে দিতে পারে।
অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতা : পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস হলো উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা লাখ লাখ কর্মীর রেমিট্যান্স। দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে এই অর্থনীতি ধসে পড়বে। এছাড়া জ্বালানি তেলের জন্য পাকিস্তান সৌদির ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে, অধ্যাপক ইলহান নিয়াজ মনে করেন, পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে ইসরায়েলি প্রভাব বিস্তার বা ইরানের গৃহযুদ্ধে পতন ইসলামাবাদের জন্য জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি।
পাকিস্তানের হাতে থাকা শেষ বিকল্প
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান সরাসরি ইরানে কোনো যুদ্ধবিমান পাঠাবে না। তার বদলে তারা সৌদি আরবে অতিরিক্ত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পাঠাতে পারে। এটি সামরিকভাবে কার্যকর হলেও ইরানকে সরাসরি ক্ষুব্ধ করার ঝুঁকি কমাবে। তবে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো যদি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে রিয়াদ পাকিস্তানকে সরাসরি যুদ্ধে নামতে বাধ্য করতে পারে।
২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধে পাকিস্তান নিরপেক্ষ থাকলেও, ২০২৬-এর এই প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। একদিকে চুক্তির বাধ্যবাধকতা ও অর্থনৈতিক চাপ, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ভয়। পাকিস্তান বর্তমানে একটি জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক