ইরানে স্তিমিত হচ্ছে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কবলে পড়ে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর পর ইরানে বিক্ষোভ স্তিমিত হয়ে এসেছে। আজ শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) পর্যবেক্ষকরা এ কথা জানিয়েছেন। দেশটিতে ধর্ম-ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভটি এক সপ্তাহ আগে শুরু হয়েছিল। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও আপাতত থেমে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। একজন সৌদি কর্মকর্তা বলেছেন, উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের নেতাদের একটি ‘সুযোগ’ দেওয়ার জন্য রাজি করিয়েছেন।
অর্থনৈতিক দুর্দশার মধ্যে গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে ব্যবসায়ীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরবর্তীতে এটি ১৯৭৯ সালে বিপ্লবের পর ইরানে চালু হওয়া ধর্ম-ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার অপসারণের দাবিতে গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
গত ৮ জানুয়ারি ইরানের বড় বড় শহরগুলোতে মানুষ রাস্তায় নেমে আসতে শুরু করে। সরকার তাৎক্ষণিক ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়। আন্দোলন ঠেকাতে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখা হয়।
বিক্ষোভ পর্যবেক্ষণকারী যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার জানিয়েছে, দমন-পীড়নে আপাতত বিক্ষোভ থেমে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। তবে সরকারের নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক অবস্থান জোরালো নয়, এতে বিক্ষোভ আবারও শুরু হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
নরওয়ে-ভিত্তিক অধিকার সংগঠন ইরান হিউম্যান রাইটস (আইএইচআর) বলছে, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ৩ হাজার ৪২৮ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে প্রকৃত নিহতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
আইএইচআরের পরিচালক মাহমুদ আমিরি-মোঘাদ্দাম বলেছেন, সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অধীনে সরকার সবচেয়ে গুরুতর অপরাধ করেছে। আইএইচআরের পাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীদের ভয়াবহ বিবরণের ব্রাতে তিনি বলেন, সেখানে পালানোর চেষ্টার সময় বিক্ষোভকারীদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সামরিক-গ্রেডের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে এবং আহত বিক্ষোভকারীদের রাস্তায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।
মনিটর নেটব্লকস নামের একটি সংস্থা জানিয়েছে, ১৮০ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে ইরানে সম্পূর্ণ ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এই সময়সীমা ২০১৯ সালের বিক্ষোভের সময় আরোপিত একই ধরনের ব্যবস্থার চেয়েও বেশি দীর্ঘ।
গত জুনে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধে সমর্থন ও অংশগ্রহণকারী যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছিলেন। কোনো বিক্ষোভকারীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হচ্ছে কিনা সেদিকে কড়া নজর রাখছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সব পক্ষের উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য আপাতত বন্ধ হচ্ছে। সৌদি আরবের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) এএফপিকে বলেন, সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের নেতৃত্বে ভালো কিছু করে দেখানোর জন্য ইরানকে একটি সুযোগ দিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রাজি করানোর দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখন শেষের দিকে।
ওয়াশিংটনও নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসে বলেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য সমস্ত বিকল্পগুলো আলোচনার টেবিলে রয়েছে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লিভিট বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের বলেন, প্রেসিডেন্ট আজ বুঝতে পেরেছেন, ইরানে নির্ধারিত ও অনুমিত ৮০০টি মৃত্যুদণ্ড স্থগিত করা হয়েছে।
২৬ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী এরফান সোলতানির ভাগ্যে কী ঘটছে, তার দিকে নজর রাখছিলেন অধিকার কর্মীরা। ওয়াশিংটন জানিয়েছিল, বুধবারের মধ্যেই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে। তবে ইরানের বিচার বিভাগ নিশ্চিত করেছে, সোলতানিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি। সোলতানির বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অনুযায়ী, তার মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি নেই।
এদিকে, গতকাল বৃহস্পতিবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক সুপ্রিম কাউন্সিলের সেক্রেটারি আলী লারিজানিসহ দেশটির কয়েকজন কর্মকর্তার ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইরানি বংশোদ্ভূত মার্কিন সাংবাদিক মাসিহ আলিনেজাদ বলেন, ইরানে ধর্ম-ভিত্তিক শাসন ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ‘সব নাগরিক ঐক্যবদ্ধ’।
বৈঠকে ইরানের প্রতিনিধি গোলাম হোসেন দারজি ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকে ভূ-রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক