মিয়ানমারে নির্বাচনের শেষ ধাপ : নিশ্চিত জয়ের পথে জান্তা সমর্থিত দল
মিয়ানমারে মাসব্যাপী নির্বাচনের চূড়ান্ত ধাপ আজ রোববার (২৫ জানুয়ারি) শুরু হয়েছে। এতে সামরিক বাহিনী-ঘনিষ্ঠ শক্তিশালী রাজনৈতিক দলটি ভূমিধস জয়ের পথে রয়েছে। তবে সমালোচকদের মতে, জান্তা-পরিচালিত এই ভোট মূলত সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখলকে আরও দীর্ঘায়িত করবে।
ক্রান্তীয় দেশ মিয়ানমারে সামরিক শাসনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, তবে জেনারেলরা গত এক দশকের বেসামরিক নেতৃত্বাধীন সংস্কার প্রক্রিয়ার সময় কিছুটা নেপথ্যে ছিলেন। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে, এ সময় গণতান্ত্রিক নেত্রী অং সান সু চি-কে বন্দি করা হয়। এর ফলে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং মিয়ানমার এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে নিমজ্জিত হয়। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
অভ্যুত্থানের পাঁচ বছর পূর্তির মাত্র এক সপ্তাহ আগে, আজ রোববার সকাল ৬টায় দেশের ডজন খানেক নির্বাচনি এলাকায় তৃতীয় ও শেষ পর্যায়ের ভোট গ্রহণ শুরু হযয়েছে। তবে বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে কোনো ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে না।
সামরিক বাহিনী এই নির্বাচনকে ‘জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া’র প্রতিশ্রুতি হিসেবে প্রচার করলেও মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, নির্বাচনের প্রস্তুতি পর্বে জোর-জবরদস্তি এবং ভিন্নমত দমনের চিত্রই ফুটে উঠেছে।
এএফপির সাংবাদিকরা দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মান্দালয়ে ভোট গ্রহণ শুরু হতে দেখেছেন। এখানে ৫৩ বছর বয়সী শিক্ষক জাও কো কো মিন্ট ভোরে একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভোট দেন। তিনি এএফপি-কে বলেন, ‘আমি খুব বেশি আশা না করলেও, একটি ভালো দেশ দেখতে চাই। ভোট দেওয়ার পর আমি স্বস্তি বোধ করছি, যেন আমার দায়িত্ব পালন করলাম।’
পাঁচ বছর আগে অভ্যুত্থানবিরোধী বিক্ষোভের ওপর রক্তক্ষয়ী দমন-পীড়নের স্থান হিসেবে পরিচিত ইয়াঙ্গুনের হ্লাইংথাইয়া টাউনশিপেও ভোট শুরু হতে দেখা গেছে। সু চি-কে আটকে রাখা এবং তার অত্যন্ত জনপ্রিয় দলটিকে বিলুপ্ত করার ফলে গণতন্ত্রপন্থিরা বলছেন, এই নির্বাচন সামরিক মিত্রদের পক্ষে সাজানো হয়েছে।
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইয়াঙ্গুনের ৩৪ বছর বয়সী এক বাসিন্দা এএফপি-কে বলেন, ‘এই নির্বাচন থেকে আমি কিছুই আশা করি না। পরিস্থিতি এভাবেই টেনেহিঁচড়ে চলতে থাকবে।’
অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের উদ্যোগে গঠিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) নির্বাচনের প্রথম দুই ধাপে নিম্নকক্ষের ৮৫ শতাংশেরও বেশি এবং উচ্চকক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করেছে। এছাড়া সামরিক বাহিনীর তৈরি করা সংবিধানে উভয় কক্ষের এক-চতুর্থাংশ আসন সশস্ত্র বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে ইউএসডিপি সামরিক বাহিনীর একটি ‘পুতুল’ দল।
দেশটির সম্মিলিত পার্লামেন্ট পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবে, অবশ্য জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং এই পদের দায়িত্ব নেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক বাহিনী তাদের শাসনের ওপর একটি ‘বেসামরিক বৈধতার আবরণ’ দিতেই এই নির্বাচনের মহড়া দিচ্ছে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য চাপের মুখে থাকা ইয়াঙ্গুনের সেই অজ্ঞাতনামা বাসিন্দা জানান, তিনি ইউএসডিপি ছাড়া অন্য যেকোনো দলকে ভোট দেওয়ার প্রতিশ্রুতি করেছেন। তিনি বলেন, ’আমি জানি চূড়ান্ত ফলাফল কী হবে, কিন্তু আমি আমার ভোট দিয়ে তাদের সাজানো খেলায় কিছুটা বিঘ্ন ঘটাতে চাই।’
নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক ফলাফল এই সপ্তাহের শেষের দিকে প্রত্যাশিত হলেও, ইউএসডিপি আগামীকাল সোমবারই নিজেদের বিজয় ঘোষণা করতে পারে। ২০২০ সালের শেষ নির্বাচনে সু চি-র ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) এই দলটিকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেছিল। এর পরপরই ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক বাহিনী ব্যাপক ভোট জালিয়াতির ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে। ৮০ বছর বয়সী নোবেল বিজয়ী সু চি বর্তমানে একটি অজ্ঞাত স্থানে বন্দি আছেন এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
‘নিরাপদ নয় মোটেই’
সামরিক বাহিনী দীর্ঘকাল ধরে নিজেদের মিয়ানমারের অখণ্ডতা রক্ষার একমাত্র শক্তি হিসেবে দাবি করে আসছে। কিন্তু তাদের অভ্যুত্থান দেশটিকে পূর্ণ মাত্রার গৃহযুদ্ধে ঠেলে দিয়েছে। দেশটিতে গণতন্ত্রপন্থী গেরিলা এবং জাতিগত সংখ্যালঘু সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
দেশের কিছু অঞ্চলে ঘন ঘন বিমান হামলা হচ্ছে, কোথাও আপেক্ষিক শান্তি বিরাজ করছে, আবার কিছু এলাকা অবরুদ্ধ থাকায় সেখানে দুর্ভিক্ষের ছায়া দেখা দিচ্ছে।
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন পার্লামেন্ট প্রার্থী অভিযোগ করেন, নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রার্থীরা কোনো প্রচার চালাতে পারেননি। তিনি অনুমান করে বলেন, তার নির্বাচনি এলাকার ১০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে মাত্র একটি খোলার সম্ভাবনা রয়েছে।
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধে নিহতের কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব নেই। তবে সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘এসিএলইডি’-এর তথ্যমতে, এই লড়াইয়ে সব পক্ষ মিলিয়ে ৯০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, নির্বাচনের ‘বিঘ্ন ঘটানোর কাজকে’ নিষিদ্ধ করে জান্তার তৈরি করা নতুন কঠোর আইনের আওতায় চার শতাধিক মানুষকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়েছে। এই আইনে বিক্ষোভ বা সমালোচনা করলে ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এমনকি নির্বাচনের সমালোচনা করা ফেসবুক পোস্টে কেবল ‘হার্ট’ ইমোজি দেওয়ার কারণেও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপে ভোটদানের হার ছিল ৫০ শতাংশের কিছু বেশি, যেখানে ২০২০ সালে এই হার ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক