বিশ্ববাজারেও দাম বেড়ে ইতিহাস স্বর্ণের
বিশ্ববাজারে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছর স্বর্ণের দাম ইতোমধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি বেড়েছে, যা একে স্মরণকালের সবচেয়ে শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী ধারায় নিয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর মধ্যে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে উত্তেজনা, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া বাণিজ্য নীতির কারণে বিনিয়োগকারীরা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন। খবর বিবিসির।
স্থানীয় সময় শনিবার (২৪ জানুয়ারি) ট্রাম্প হুমকি দেন, কানাডা যদি চীনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করে, তাহলে দেশটির ওপর ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এতে বাজারে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
স্বর্ণ ও রুপাকে সাধারণত ‘সেইফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হয়। অনিশ্চিত সময়ে বিনিয়োগকারীরা এসব ধাতুর দিকে ঝুঁকে পড়েন। শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) রুপার দামও ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রতি আউন্স ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। গত বছরই রুপার দাম প্রায় ১৫০ শতাংশ বেড়েছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েকটি কারণে স্বর্ণের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে- বিশ্বজুড়ে উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, মার্কিন ডলারের দুর্বলতা, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাপক স্বর্ণ কেনা, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সম্ভাব্য সুদহার কমানোর প্রত্যাশা। এছাড়া ইউক্রেন ও গাজায় যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করার মতো ঘটনাও বাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
আরও পড়ুন : আজ রেকর্ড সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে স্বর্ণ
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ইতিহাসজুড়ে এখন পর্যন্ত মাত্র প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার ২৬৫ টন স্বর্ণ উত্তোলন করা হয়েছে। এত সোনা দিয়ে মাত্র ৩ থেকে ৪টি অলিম্পিক সুইমিং পুল ভরানো যাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) হিসাব অনুযায়ী, মাটির নিচে এখনও প্রায় ৬৪ হাজার টন স্বর্ণ উত্তোলনযোগ্য আছে। তবে ভবিষ্যতে স্বর্ণের সরবরাহ বৃদ্ধির গতি কমে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এবিসি রিফাইনারির গ্লোবাল হেড নিকোলাস ফ্রাপেল বলেন, স্বর্ণ এমন একটি সম্পদ, যা কারও ঋণের সঙ্গে যুক্ত নয়—বন্ড বা শেয়ারের মতো নয়। এটি অনিশ্চিত সময়ে দারুণ একটি বিকল্প বিনিয়োগ।
২০২৫ সালে স্বর্ণ ১৯৭৯ সালের পর সবচেয়ে বেশি বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের শেয়ার নিয়ে উদ্বেগ এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এ বছর যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ দুই দফা সুদহার কমাতে পারে। সুদ কমলে বন্ডের মতো বিনিয়োগ কম আকর্ষণীয় হয়, তখন মানুষ স্বর্ণ ও রুপার দিকে ঝোঁকে।
শুধু বিনিয়োগকারীরাই নয়, বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও গত বছর শত শত টন স্বর্ণ কিনেছে।
ভারতে দীপাবলির মতো উৎসবে স্বর্ণ কেনাকে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করা হয়। মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক মরগান স্ট্যানলির হিসাবে, ভারতীয় পরিবারগুলোর কাছে থাকা স্বর্ণের মূল্য প্রায় ৩.৮ ট্রিলিয়ন ডলার—যা দেশটির জিডিপির প্রায় ৮৯ শতাংশের সমান।
চীন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্বর্ণ ভোক্তা বাজার। চীনা নববর্ষকে ঘিরে সাধারণত স্বর্ণের চাহিদা আরও বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাজার এখন অনেকটাই ‘খবরনির্ভর’। ভালো কোনো বৈশ্বিক খবর এলে স্বর্ণের দাম কিছুটা কমতেও পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা থাকায় স্বর্ণের প্রতি আগ্রহ আপাতত কমবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক