মার্কিন ঘাঁটি ও রণতরীতে আঘাতের হুমকি ইরানের
‘তেহরানের সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে’- মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন সতর্কতার পর এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে সন্ত্রাসী তালিকাভুক্ত করার প্রতিক্রিয়ায় ইরান পাল্টা হুমকি দিয়ে বলেছে, দেশটির ওপর যেকোনো হামলার জবাবে তারা তাৎক্ষণিকভাবে মার্কিন ঘাঁটি ও বিমানবাহী রণতরীগুলোতে আঘাত হানবে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপির।
ব্রাসেলস এবং ওয়াশিংটন যখন তাদের সুর কঠোর করছে এবং ইরান চরম মাত্রার হুঁশিয়ারি দিচ্ছে, তখন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস পারমাণবিক আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, সংকট এড়াতে হবে কেননা এর ফলাফল এই অঞ্চলের জন্য বিধ্বংসী হতে পারে।
ইরানের একজন সামরিক মুখপাত্র সতর্ক করে বলেছেন, যেকোনো মার্কিন পদক্ষেপের বিপরীতে তেহরানের প্রতিক্রিয়া সীমাবদ্ধ থাকবে না—যেমনটি গত বছরের জুনে দেখা গিয়েছিল। সে সময় মার্কিন যুদ্ধবিমান ও ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েলের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আকাশযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। তবে এবার ‘তাৎক্ষণিকভাবে একটি চূড়ান্ত জবাব’ দেওয়া হবে।
এ প্রসঙ্গে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আক্রামিনিয়া রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলোর মারাত্মক দুর্বলতা রয়েছে এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা বেশকিছু মার্কিন ঘাঁটি ‘আমাদের মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যে’ রয়েছে।
জেনারেল আক্রামিনিয়া বলেন, আমেরিকানরা যদি এমন কোনো ভুল হিসাব করে, তবে তা নিশ্চিতভাবেই ট্রাম্পের কল্পনা অনুযায়ী ঘটবে না। বিষয়টি এমন হবে না যে, তিনি দ্রুত একটি অভিযান চালাবেন এবং দুই ঘণ্টা পর টুইট করবেন যে, অভিযান শেষ।
উপসাগরীয় অঞ্চলের একজন কর্মকর্তা এএফপি-কে বলেছেন, ইরানের ওপর মার্কিন হামলার আশঙ্কা এখন ‘খুবই স্পষ্ট’। তিনি আরও বলেন, ‘এটি এই অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা বয়ে আনবে, যা কেবল এই অঞ্চলের অর্থনীতি নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং তেল-গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী করে তুলবে।’
রক্তে ভেজা দমন-পীড়ন
কাতার নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, দেশটির আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান টেলিফোনে ‘উত্তেজনা প্রশমন এবং স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা’ নিয়ে আলোচনা করেছেন।
এদিকে, সাম্প্রতিক গণবিক্ষোভে প্রাণঘাতী দমন-পীড়নের দায়ে ইসলামি রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-কে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করে চাপ আরও বাড়িয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইইউ প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েন এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, যে শাসনব্যবস্থা নিজের জনগণের আন্দোলনকে রক্ত দিয়ে পিষে ফেলে, তাদের ‘সন্ত্রাসী’ বলাই সংগত।
এই সিদ্ধান্তটি অনেকাংশে প্রতীকী হলেও, তেহরান ইতিমধ্যে এর বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ইরানের সামরিক বাহিনী ইইউ-এর এই পদক্ষেপকে অযৌক্তিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং বিদ্বেষপ্রসূত বলে নিন্দা জানিয়েছে।
তেহরানের জনমনে উদ্বেগ
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) তেহরানের রাস্তায় নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের বিষণ্ণ আত্মসমর্পণ লক্ষ্য করা গেছে। ২৯ বছর বয়সী একজন ওয়েট্রেস নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমার মনে হয় যুদ্ধ অনিবার্য এবং একটি পরিবর্তন হওয়া দরকার। সেটি ভালোর জন্য হতে পারে, আবার খারাপও হতে পারে।’ উত্তর তেহরানের আরেকজন বেকার নারী বলেন, ‘আমরা এখন জীবনের সর্বনিম্ন বিন্দুতে আছি। না অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো, না আমাদের জীবিকা।’
ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ডিসেম্বরের শেষে শুরু হওয়া বিক্ষোভে আন্দোলনকারীদের হত্যা করা হলে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে তার সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির দিকে মোড় নিয়েছে। বুধবার তিনি বলেছিলেন, তেহরানের চুক্তিতে আসার সময় ফুরিয়ে আসছে।
নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দাবি
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তারা বিক্ষোভে ৬ হাজার ৪৭৯ জন নিহত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে ইন্টারনেট সংযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে যাচাই প্রক্রিয়া ধীর হওয়ায় নিহতের প্রকৃত সংখ্যা কয়েক হাজার হতে পারে বলে সংস্থাটি সতর্ক করেছে।
ইরানি কর্তৃপক্ষ তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও তাদের দাবি, নিহতদের অধিকাংশই নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য অথবা ‘দাঙ্গাকারীদের’ হাতে নিহত সাধারণ মানুষ। বর্তমানে তেহরানের দেয়ালে দেয়ালে বিশাল সব পোস্টার লাগানো হয়েছে, যার একটিতে মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ধ্বংস হওয়ার দৃশ্য দেখানো হয়েছে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক