মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যেভাবে ক্ষতি করতে পারে বিশ্ব অর্থনীতির
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত গত এক বছর ধরে ট্রাম্পের শুল্কারোপ এবং বাণিজ্য ব্যবস্থায় অন্যান্য বিঘ্নতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতার পরীক্ষা নেবে। এই অঞ্চলে সাম্প্রতিক অস্থিরতার মাত্র এক সপ্তাহ পরই বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনীতে ইতোমধ্যে চাপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে ভারতের বন্দরে আটকে থাকা চাল রপ্তানি থেকে শুরু করে খাদ্য উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সারের দামের ঊর্ধ্বগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। খবর সিএনএনের।
দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি বাড়তে পারে। এর সঙ্গে সুদের হারও বৃদ্ধি পেতে পারে, যা ঋণগ্রহীতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। এদিকে, পণ্যবাহী জাহাজ চলাচলের ওপর দেওয়া হুমকি সরবরাহ শৃঙ্খলকে বিঘ্নিত করতে পারে, যার ফলে ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের জন্য পণ্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ড্যান কাটজ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত বিভিন্ন মেট্রিক্সে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর অত্যন্ত প্রভাব ফেলতে পারে, যেমন মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি।
অর্থনৈতিক পরিণতির তীব্রতা নির্ভর করবে যুদ্ধ কতদিন স্থায়ী হবে তার ওপর। গত শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আক্রমণ করার আগে, আইএমএফ আশা প্রকাশ করেছিল--চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে, যা বেশ ইতিবাচক। যুদ্ধ শুরুর পর আইএমএফ এখনও তার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করেনি, তবে সংস্থাটি বলেছে, অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়ন এত তাড়াতাড়ি নয়।
আইএমএফ আরও বলেছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ঘটনাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বেশ কয়েকটি ঝুঁকি তালিকাভুক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ব্যবস্থায় আরও ব্যাঘাত, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং আর্থিক বাজারে অস্থিরতা।
জ্বালানির দামই মূল চাবিকাঠি
বিশ্ব অর্থনীতিতে এই সংঘাতের প্রভাব মূলত জ্বালানি তেলের দামের ওপর নির্ভরশীল। সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের কারণে এই সপ্তাহে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে। বিগত ১৮ মাসেও অপরিশোধিত তেলের এমন পর্যায়ের বেচাকেনা দেখা যায়নি।
প্রধান ঝুঁকির বিষয়টি হলো গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকা নিয়ে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের প্রচুর তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাস বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে এই রুটেই পাঠানো হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যমতে, একদিকে ইরান এবং অন্যদিকে ওমান বেষ্টিত এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে বিশ্বের জন্য দৈনিক উৎপাদিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক পঞ্চমাংশ পরিবহণ করা হয়।
গোল্ডম্যান শ্যাক্সের তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালী কার্যত চলাচলের অযোগ্য হওয়ায় ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য আকাশচুম্বী হবে। যদি এ প্রণালী দিয়ে পণ্য পরিবহণ দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকে, তাহলে মূল্যবৃদ্ধি হবে দ্বিগুণের বেশি।
গত বুধবার ইউরোপের বৃহত্তম অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন এডিএসি জানায়, গত সপ্তাহে জার্মানিতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম দুই অঙ্কে বেড়েছে। যুক্তরাজ্যেও পেট্রোলের দাম বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম এখন ১১ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এতে ছোট ব্যবসার ওপর চাপ পড়েছে।
গোল্ডম্যান শ্যাক্স জানায়, তেলের দাম যদি কয়েক মাস ধরে বর্তমান পর্যায়ে থাকে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি জানুয়ারিতে থাকা ২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে বেড়ে বছরের শেষ নাগাদ ৩ শতাংশ হতে পারে। এর ফলে ফেডারেল রিজার্ভের জন্য এ বছর সুদের হার কমানো আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে, এশিয়ার অবস্থা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিক্সের তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে এই অঞ্চলের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহণ করা হয়। এর প্রধান ক্রেতা হলো চীন। বিশেষভাবে এই যুদ্ধ চীনের জন্য কঠিন এক মুহূর্তে এসেছে। কারণ দেশটিতে গত বৃহস্পতিবার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার এশিয়ার অর্থনীতিবিদরা এক বিবৃতিতে বলেন, ইরানের ওপর হামলার ফলে এশিয়ার বেশিরভাগ দেশের অর্থনীতির অবস্থা আরও খারাপ হবে এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতিতে ভুগবে। অপরিশোধিত তেলের দাম বর্তমান পর্যায়ে থাকলে বেশিরভাগ দেশে মুদ্রাস্ফীতি আধা শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্নতা
জ্বালানির দামের পাশাপাশি এশিয়ার দেশগুলো আরেকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, সেটা হলো রপ্তানি।
অল ইন্ডিয়া রাইস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সতীশ গোয়েল বলেন, ভারত ইতোমধ্যে যন্ত্রণা অনুভব করছে। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় রপ্তানির জন্য দেশে উৎপাদিত চার লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি বাসমতি চাল ভারতীয় বন্দরে বা পরিবহণে আটকে আছে। ভারতের বার্ষিক বাসমতি চাল রপ্তানির প্রায় ৭৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৬০ লাখ টন মধ্যপ্রাচ্যে যায়।
আইএনজি ব্যাংকের এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গবেষণা দলের প্রধান দীপালি ভার্গব বলেন, মার্কিন শুল্ক বৃদ্ধির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এশীয় রপ্তানিকারকদের জন্য মধ্যপ্রাচ্য গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠেছে। গত সোমবার এক নোটে তিনি লেখেন, যদি এই সংঘাত অব্যাহত থাকে, তাহলে ভারত ও চীন সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
ভারতের অস্থির চাল রপ্তানি আরও বড় উদ্বেগের দিকে ইঙ্গিত করছে, কারণ বিশ্ব বাণিজ্য এবং খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক ব্যাঘাতের আশঙ্কার রয়েছে।
নরওয়ের রাসায়নিক কোম্পানি ইয়ারা ইন্টারন্যাশনালের সিইও সভেইন টোর হোলসেথার বৃহস্পতিবার সিএনএনকে বলেন, বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদন ও পরিবহণের জন্য হরমুজ প্রণালী অপরিহার্য। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইউরিয়া সার রপ্তানি হয় এই প্রণালী দিয়ে। সার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাঁচামালও এই প্রণালী দিয়ে বিশাল সরবরাহ করা হয়। সার কেবল সাধারণ কোনো পণ্য নয়, বিশ্বব্যাপী খাদ্য উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই এটির ওপর নির্ভরশীল।
এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে অনেক বিমান চলাচল বন্ধ থাকায় এবং এই অঞ্চলে আকাশসীমা কঠোরভাবে সীমিত করায় উড়োজাহাজে পণ্য পরিবহণ আরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অ্যাডিডাস এই সপ্তাহে সতর্ক করে বলেছে, বিমান পরিবহণের মাধ্যমে পাঠানো কিছু চালান পৌঁছাতে বিলম্ব হতে পারে। এমিরেটস, কাতার এয়ারওয়েজ ও ইতিহাদসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিমান পরিষেবার কোম্পানিগুলো বিশ্বব্যাপী বিমান পরিবহণ ক্ষমতার প্রায় ১৩ শতাংশ। আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহন সংস্থার মতে, মূল্যের দিক থেকে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় এক তৃতীয়াংশের পণ্য বিমানে পরিবহণ হয়। সাধারণত স্মার্টফোন, মাইক্রোচিপ এবং অন্যান্য ইলেকট্রনিক্সের মতো উচ্চমূল্যের মালামাল পরিবহণ করা হয় আকাশপথে।

এনটিভি অনলাইন ডেস্ক